Friday, November 28, 2014

যশোদাবেনের উদ্বেগ- সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন নিরাপত্তা নিয়ে

সরকারি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্ত্রী যশোদাবেন। তাকে দেয়া এ নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি এক চিঠিতে সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন- আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী। আমি জানতে চাই ভারতীয় সংবিধান ও আইনের কোন ধারায় আমাকে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় এ চিঠি লিখেছেন তিনি। যশোদাবেন লিখেছেন, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। আমাকে যে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে আমি আতঙ্কিত। সুতরাং আমার জন্য যে নিরাপত্তা রক্ষী দেয়া হয়েছে, তাদের বিস্তারিত তথ্য আমাদের জানানো হোক। যশোদাবেন জানিয়েছেন তিনি চলাফেরা করেন বাসে বা অন্য গণপরিবহনে। আর নিরাপত্তা রক্ষীরা সরকারি গাড়িতে চড়ে তাকে অনুসরণ করে। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা যশোদাবেনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বিয়ে হয় ১৭ বছর বয়সে। কিন্তু বহু বছর ধরে তারা একসঙ্গে থাকেন না। নরেন্দ্র মোদি যে বিবাহিত ছিলেন তা অনেকদিন পর্যন্ত  গোপন রেখেছিলেন। এ বছরের এপ্রিলে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে তিনি যে মনোনয়নপত্র জমা দেন সেখানেই তিনি প্রথম প্রকাশ করেন যে, যশোদাবেন তার স্ত্রী। যশোদাবেন গুজরাটের মেহসানা জেলায় তার ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। এ বছরের শুরুতে ভারতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি মাসে ১৪ হাজার রুপি পেনশন পান, সেই অর্থেই তার জীবন চলে। নরেন্দ্র মোদি বরাবরই তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। বলা হয়ে থাকে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভোটারদের আকর্ষণের জন্য তিনি কৌমার্যব্রত নিয়েছেন বলে দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গত মে মাসে বিপুল ভোটে বিজেপি’র বিজয়ের পর নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন থেকে তার স্ত্রী যশোদাবেনকে ২৪ ঘণ্টার নিরাপত্তা দেয়া হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানিয়েছিলেন, বিয়ের তিন বছর পরই স্বামীর কাছ থেকে তিনি আলাদা হয়ে যান। বিয়ের পর তারা মাত্র তিন মাস একসঙ্গে ছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সমালোচকরা অভিযোগ করে থাকেন যে, তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস) যোগ দেয়ার পর স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেন। তারা বলে থাকেন, তিনি যে এত বছর ধরে তার স্ত্রীকে অস্বীকার করে এসেছেন, সেটাই প্রমাণ করে নারীদের ব্যাপারে তিনি কি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

অদৃশ্য আবরণ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে

মহাশূন্যে ভাসমান ‘ঘাতক ইলেকট্রন’। এর গতি আলোর গতির কাছাকাছি। যদি এই ইলেক্ট্রন একবার পৃথিবীকে আঘাত করতে পারে তাহলে সব স্যাটেলাইন ও মহাশূন্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দ্রুত পরিবর্তন হবে পৃথিবীর জলবায়ু। দ্রুত গতিতে বাড়বে ক্যানসার। কিন্তু এমন সব ভয়াবহ ঘাতক ইলেক্ট্রনের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করছে অদৃশ্য এক আবরণ। একে রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উপরে আমাদের ঘিরে রয়েছে এমন এক আবরণ। এর ফলে ঘাতক ইলেকট্রন প্রবেশ করতে পারছে না পৃথিবীতে। তাই পৃথিবীতে পরিবর্তন হচ্ছে খুব মন্থর গতিতে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অদৃশ্য আবরণ পৃথিবী থেকে ৭২০০ মাইল উপরে। বোমার মতো চরিত্র নিয়ে যে সব ঘাতক ইলেক্ট্রন আমাদের পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে তাকে প্রতিরোধ করছে এই আবরণ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই ঘাতক ইলেক্ট্রন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্যও এক রকম হুমকি। এখন পর্যন্ত এমন আবরণের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পারলেও তা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, আসলে কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে তারা হতবুদ্ধি। তারা এ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছেন না। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বুলডার-এর প্রফেসর ডানিয়েল বেকার বলেছেন, এমন আবরণ তৈরি করা হয়েছিল ‘স্টার ট্রেক’ ছবিতে। ওই ছবিতে ওই আবরণ অন্য গ্রহের আগন্তুকদের অস্ত্রকে প্রতিহত করতে ব্যবহার করা হয়েছে। আসলেই ঠিক সেই রকম অদৃশ্য আবরণ তৈরি হয়ে আছে আমাদের পৃথিবীর ওপরে। এ আবরণ ঘাতক ইলেকট্রনকে প্রতিরোধ করছে। এই আবরণটি আবিষ্কার করা হয়েছে ভ্যান অ্যালেন তেজস্ক্রিয় বেল্টে। দু’টি বলয়ের পৃথিবীর উপরে রিংয়ের মতো সৃষ্টি করেছে। এতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইলেকট্রন ও প্রোটন। নির্দিষ্ট অবস্থানে এগুলো অবস্থান করছে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা। সূর্যের আলো প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে এই বেল্টের আয়তন বাড়ে বা কমে। এই রিং আবিষ্কার করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। এতে রয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় দু’টি বলয়। গত বছর প্রফেসর বেকার একটি টিমের নেতৃত্ব দেন। তারা এ নিয়ে গবেষণা করেন।

মামার বন্দিশালায় মা-ছেলের ৫ বছর by নাজমুল হক শামীম

‘আমি পড়তে চাই, মুক্তি চাই’- কয়েকটি শব্দের একটি চিরকুট বন্ধ ঘরের জানালা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয় ১১ বছরের বালক জীমুন। এক ব্যক্তি চিরকুটটি কুড়িয়ে স্থানীয় একটি পত্রিকায় পৌঁছে দেন। পত্রিকায় সংবাদ ছাপার পর গত বুধবার সন্ধ্যায় ফেনী শহরের রামপুরে ওই বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। ৫ বছর ধরে এক ঘরে বন্দি ভিকারুননিছা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা জাহানারা বেগম রোজি ও তার ছেলে মেহেদি ইসলাম জীমুনকে এ সময় নির্জন ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের চিকিৎসার জন্য ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দীর্ঘ ৫ বছরে এক মিনিটের জন্যও মা-ছেলে সূর্যের আলো দেখেননি। অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন তারা। রোজির ভগ্নিপতি নুরু ইসলাম জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে মাস্টার্স শেষ করে ভিকারুননিছা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করতেন জাহান আরা বেগম রোজি (৪৫)। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা আবুল কালাম আজাদ ভূঞার সঙ্গে ২০০০ সালে তার বিয়ে হয়। তিন বছর সংসার জীবনের পর ২০০৩ সালে দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। রোজির সাবেক স্বামী বর্তমানে সিলেটের জয়িন্তাপুর উপজেলায় সমাজসেবা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর রোজি ফেনী শহরের রামপুর এলাকার বাবার বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। এরই মধ্যে রোজি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ছোট ভাই শের শাহ’র সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রোজির ভাই শের শাহ তাকে ওই ঘরে ভাগিনা জীমুনসহ তালাবন্ধ করে চলে যায়। এদিকে রোজিনার ২ ভাই, ৬ বোনের মধ্যে অপর ভাই শাহেন শাহ মানসিক ভারসাম্যহীন। এক বোন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের ভয়ে অন্য চার বোনের কেউ রোজির খোঁজ নিতে আসেন না। তাদের তিনজন ঢাকায়, অপরজন ফেনী শহরেই বসবাস করেন। তিনি শহরের রামপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। শহরের বিশাল বাড়িতে দুটি পাকা ঘরের একটিতে দীর্ঘদিন ধরে তালা। অন্য ঘরের দুটি কক্ষ ভাড়া দেয়া হয়। ভাড়ার ৪ হাজার টাকা দিয়ে চলতো রোজির ও তার সন্তানের সব ভরণ-পোষণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাড়াটিয়া জানান, তালাবদ্ধ ওই কক্ষের জানালা দিয়ে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দেয়া হতো। এতে মা-ছেলের অর্ধাহারে-অনাহারে কোন রকম দিন কাটতো। ভাড়াটিয়ারা না থাকলে ওদের মাঝেমধ্যে না খেয়েই থাকতে হতো। ভুতুড়ে ওই কক্ষের ভেতরে একটি লাইট থাকলেও পাখাটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল ছিল। কক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় উৎকট গন্ধ বের হতো। জীমুন জানায়, পড়াশোনার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সে নার্সারির পর আর পড়তে পারেনি। কথা বলতে চাইলেও মায়ের বাধায় বারবার থেমে যায় জীমুন। জীমুন আরও জানায়, আমার আম্মুর সঙ্গে ২০১০ থেকে ৫ বছর ধরে আমার মামা অন্যায়ভাবে আমাকে আটকে রেখেছে। আমি পড়তে চাই, খেলতে চাই। আমি মুক্তি চাই। খবর পেয়ে বুধবার বিকালে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ তত্ত্বাবধানে অভিযান চালিয়ে ঘরের তালা ভেঙে ও তিনটি লোহার দরজা কেটে তাদের উদ্ধার করা হয়। ফেনী সদর হাসপাতালের চিকিৎসক অসীম কুমার সাহা জানান, ৫ বছর এক ঘরে বন্দি থাকায় রোজি মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়ায়  আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। জীমুন রিকেট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তাদের ফেনী সদর হাসপাতালের একটি কেবিনে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ফেনী পুলিশ সুপার মো. রেজাউল হক জানান, তাদের সুস্থ করার পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওয়তায় আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে জীমুনের পিতার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাদের বর্তমান অবস্থার কথা জানানো হয়েছে।

নামেই মানসিক হাসপাতাল by রাজিউর রহমান রুমি

পাবনা মানসিক হাসপাতালে ৫ শ’ রোগীর জন্য মাত্র ১০ জন ডাক্তার। হাসপাতালটি নিজেই এখন মানসিক রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালের ভবনগুলো জরাজীর্ণ, চিকিৎসক ও নার্সের অভাব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নেই কোন বিশেষ সুবিধা, সিটের অপ্রতুলতার কারণে অধিক সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে এত সমস্যার মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষায়িত নার্সিং ইনস্টিটিউট, মেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বহুবিধ পরিকল্পনার প্রত্যাশা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ১৯৫৭ সালে পাবনা শহরের শীতলাই হাউজের জমিদার বাড়িতে ৬০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ হাসপাতালটি। পাবনা শহর থেকে প্রায় ৫ কি.মি পশ্চিমে হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয় এ হাসপাতাল। ১১১.২৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত নতুন ভবনে হাসপাতালটি পরবর্তীকালে ২০০ থেকে  পর্যায়ক্রমে ৪০০ বেডে উন্নীত করা হয়। ২০০৩ সালে মেন্টাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আওতায় আরও ১০০ বেডে উন্নীত  করা হয়। বর্তমানে এ হাসপাতালে ১৫০টি পেয়িং শয্যা ও ৩৫০টি নন পেয়িং শয্যা মিলে মোট ৫০০টি শয্যা রয়েছে। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন পাবনার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী। এখানে মাদকাসক্ত নিরাময় ওয়ার্ডসহ মোট ১৮টি ওয়ার্ড রয়েছে। এই হাসপাতালে বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ, বৃত্তিমূলক ও বিনোদনমূলক চিকিৎসা বিভাগ রয়েছে। এক্সরে, প্যাথলজি, ইসিজি, ইইজিসহ এই মানসিক হাসপাতালকে ঘিরে চলে চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, প্যারামেডিক্স, সেবক-সেবিকাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। ২০০ শয্যার জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ৫০০ শয্যার কার্যক্রম। ২০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবেই এখানে মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৪৭২টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩৩৬ জন। বাকি ১৩৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের প্রায় দেড় কোটি মানসিক রোগীর জন্য একমাত্র এই হাসপাতালটিতে ২টি পদ থাকলেও কোন সাইকিয়াট্রিক কনসাল্টেন্ট নেই। পাবনা মেডিক্যাল কলেজের ৩ জন সাইকিয়াট্রিক কনসাল্টেন্ট এখানে এসে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এছাড়া একটি ক্লিনিকাল সাইকিয়াট্রিস্ট এবং ২টি  সিনিয়র কনসাল্টেন্ট পদ থাকলেও তা দীর্ঘদিন লোকবল শূন্য। ৩ জন সাইকিয়াট্রিক যারা পাবনা মেডিক্যাল কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত, তারাই এখানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সেবা দিয়ে থাকেন। হাসপাতাল শুরুতে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং ইনস্টিটিউট থাকলেও তা প্রায় এক বছর চালুর থাকার পর বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালু হয়নি। ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার পদ না থাকায় জরুরি রোগীদের এসে ফিরে যেতে হয়। অথবা পরের দিনে অফিস টাইমে এসে তাদের চিকিৎসা নিতে হয়। ২৫০ জন নাসের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৭০টি। এদের আবাসিকের  কোন ব্যবস্থা নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবহনের জন্য নেই কোন যানবাহন। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ও পরিচালকের নিজস্ব যানবাহনও নেই। পরিচালকের জন্য একটি আবাসিক ভবন রয়েছে নামমাত্র। এর পরও এই জরাজীর্ণ ভবনেই পাবনা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালের বাউন্ডারি, দেয়াল, জানালা, দরজা,  গ্রিল সবকিছুই খসে পড়ছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় চুক্তি ভিত্তিতে ২৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়ে বৃহৎ এই হাসপাতালটির কাজ চলছে। অবাক হলেও সত্য, এই হাসপাতালটিতে নেই কোন নিয়োগকৃত নিরাপত্তাকর্মী। ৫০ জন রয়েছেন আনসার। এরাই কোনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ‘হাজারও সমস্যার মধ্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাবনা মানসিক হাসপাতাল।

সংগ্রামী আমেনা by সাইফুর রহমান

পেপারত মোর ছবি দিয়া কী কইরবেন, মোর কোনো উপকারে কইরবের পান না তোমরা’- এমনই বললেন সংগ্রামী আমেনা বেগম। দিন যায় রাত হয় তার অভিরাম চলা শেষ হয় না। রাত পোহালেই তাকে দেখা যায় এগ্রামে ওগ্রামে ভ্যানগাড়িতে কিছু মালপত্র নিয়ে ছুটে চলতে। আমেনা বেগম জীবন সংগ্রামী এক নারী (৫০)। ঘরবাড়ি নেই বললেই চলে। তিনি থাকেন নাগেশ্বরী পৌরসভার সাতানীপাড়া গ্রামের অন্যের জায়গায় ঝুপড়ি ঘরে। ঝুপড়িতে তিনি সন্তান-সন্ততি নিয়ে থাকেন। স্বামী আবদুুর রহমান মারা যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। কিন্তু পরের বাড়িতে কাজ করার চেয়ে নিজে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার মনোভাব নিয়ে তিনি স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। কাঠের তৈরি ছোট্ট একটি ভ্যানগাড়িতে বিস্কুট, চানাচুর, মসলা, আচার, তেল, মরিচগুঁড়া, হলুদগুঁড়া, বিভিন্ন প্রকার ডাল, সাবান ইত্যাদি মালামাল বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ভ্যানগাড়িতে এসব ক্ষুদ্র মালামাল নিয়ে প্রতিদিন এগ্রাম ওগ্রাম ছুটে বেড়াই কিন্তু তেমন বেচাকেনা হয় না। এখন প্রতিটি পাড়াগাঁয়ে রাস্তার মোড়ে কিংবা লোকালয়ে ছোট-বড় দোকান গড়ে উঠেছে। তাছাড়া গ্রামের ধনী পরিবারগুলো আমার  কাছ থেকে জিনিস কেনে না। সারাদিন গ্রাম ঘুরে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মালা মাল বিক্রি করি এতে সামান্য কিছু লাভ হয়। আসল মূলধন ঠিক রেখে লাভের অংশের টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাওয়া আর ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়ে অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা অনেক ভালো।

বিনাদোষে কারাগারে ৩৬ বছর

বিনা দোষে তিন যুগ কারাভোগের পর মুক্তি পেলেন ক্যালিফোর্নিয়ার মাইকেল রে হ্যানলাইন (৬৮)। সোমবার তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে এলএ টাইমস। ক্যালিফোর্নিয়ার ভেঞ্চুরা কাউন্টির সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক ডোনাল্ড ডি কোলম্যান হ্যানলাইনের মুক্তির আদেশ দেন। তবে তাকে পরে থাকতে হবে জিপিএস মনিটরিং ডিভাইস। আদালতের দলিল অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটনের এলাকায় প্রাপ্ত ডিএনএ নমুনা হ্যানলাইন বা তার কথিত সহযোগী কারও সঙ্গেই মেলেনি। এছাড়া মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী যখন হ্যানলাইনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সে সময় তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে বিনাদোষে সব থেকে বেশি দিন কারাভোগ করা নাগরিক হ্যানলাইন। সোমবার কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি বলেন, এটা বিশ্বাস করাও কঠিন। কেমন অনুভব করছেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সহধর্মিণীর হাত ধরে হ্যানলাইন বলেন, আমি শুধু বাড়ি যেতে চাই। আর তার সঙ্গে সময় কাটাতে চাই। স্ত্রীকে তার শক্তির স্থান বলে অভিহিত করেন হ্যানলাইন। ভেঞ্চুরা নিবাসী জে.টি. ম্যাকগ্যারিকে গুলি করে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে কোন প্রকার প্যারোলে মুক্তির সম্ভাবনা ছাড়াই হ্যানলাইনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় ১৯৮০ সালে। হ্যানলাইনের তৎকালীন বান্ধবী মেরি বিশপকে দায়মুক্তি দিয়ে বিচারকালীন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দু’সপ্তাহ আগে আদালতে দাখিলকৃত তথ্য-প্রমাণে প্রসিকিউটররা বলেছেন, কয়েক মাস ধরে একাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত মেলে যে, অন্য ব্যক্তিদের ম্যাকগ্যারিকে হত্যা করার উদ্দেশ্য এবং সামর্থ্য ছিল। এসব সাক্ষাৎকারে এও উঠে এসেছে যে, সাক্ষীদের হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে আর প্রসিকিউটরদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ১০ই নভেম্বর নিখোঁজ হয়ে যায় ম্যাকগ্যারি। দু’দিন পর .৩৮ ক্যালিবারের দু’টি গুলির ক্ষতচিহ্নসহ তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। মেরি আদালতে সাক্ষ্য দেন, হ্যানলাইন তাকে বলেছিল ম্যাকগ্যারিকে মারার কন্ট্রাক্ট ছাড়া হয়েছে আর সে তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে। সে আরও সাক্ষ্য দেয় হ্যানলাইন ঘটনার রাতে .৩৮ ক্যালিবারের বন্দুক নিয়ে বাসা থেকে বের হয় আর যখন ফিরে আসে তখন তার গায়ে কাদামাটি ছিল। হ্যানলাইন বলেছিলেন, তিনি সারা রাত মোটরসাইকেলের কাজ করছিলেন, আর বের হয়েছিলেন শুধুমাত্র বিয়ার কিনতে। মেরি আরও বলেছিল যে, সেই রাতে সে পিসিপি মিশ্রিত গাঁজা আর কোকেন সেবন করেছিল। বিচারকালে সময়ে তার ওপর যে মাদকের কড়া প্রভাব ছিল তা স্পষ্ট। ২০১০ সালে একজন কেন্দ্রীয় বিচারক হ্যানলাইনের দণ্ড স্থগিত রেখে পুনর্বিচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অপর এক মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট বিচারক ওই পরামর্শে অস্বীকৃতি জানান।

রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব

হাজারো অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের গতিবিধি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার একটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। আল-জাজিরা আমেরিকার হাতে যাওয়া বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ডকুমেন্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোয় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাস করে। স্থানীয়দের বাসাবাড়িতে আশ্রয় খুঁজে আর প্লাস্টিক শিট ও বাঁশ দিয়ে বনে কুঁড়েঘর তৈরি করেও আছে অনেকে। অতিরিক্ত ৩০ হাজার শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছে। তারা জাতিসংঘ পরিচালিত ক্যাম্পে বসবাস করছে। সেখানে তাদের গতিবিধি সীমিত আর চাকরির তেমন সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারি মাসে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন জাতীয় কৌশলের ঘোষণা দেয় ঢাকা। কিন্তু এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর সংক্ষিপ্ত আল-জাজিরা আমেরিকাকে দিয়েছে। ৩১শে মার্চ ২০১৪ তারিখে দেয়া ওই ডকুমেন্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা এবং অবস্থান নির্ণয় করার জন্য জরিপ তালিকা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। এতে বলা হয়, মৌলিক মানবাধিকার প্রয়োজন মেটাবে আইওএম আর ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস মানবাধিকার সেবাগুলো সরবরাহে সমন্বয় করবে। মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেছেন, তারা শুধু জাতিসংঘ পরিচালিত শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া শাখার উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের ওই নির্দেশনায় এমন কোন ইঙ্গিত নেই নিবন্ধিত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার দেয়া হবে কিনা। রোহিঙ্গাদের মুক্তভাবে চলাফেরা করার এবং পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের আবেদন করার সুযোগ থাকবে কিনা আইওএম সে প্রশ্ন ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের জাতিসংঘ রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটরের কার্যালয়ের দিকে। তারা আবার পাল্টা নির্দেশ করেছে আইওএম-এর দিকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একাধিকবার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোন জবাব মেলেনি। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পাওয়ার অস্বীকৃতি আর দৈনন্দিন জীবনে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে স্বীকৃতিবিহীন ও আইনি শূন্যতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। কর্মসংস্থানে বৈধতা না থাকায় নির্যাতন আর দুর্নীতির আশঙ্কা রয়েছে। ন্যায়বিচার পাওয়ারও কোন অবলম্বন নেই। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বে সর্বাধিক নির্যাতিত সম্প্রদায়ের মধ্যে রোহিঙ্গারা একটি। মিয়ানমারে ১৯৮২ সালের সংবিধানে তাদের নাগরিকত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এখন তারা চরম নির্যাতনের শিকার। ২০১২ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাংলাদেশের সমালোচনা করা হয়। মিয়ানমারের ওই সহিংসতায় গণহত্যা আর ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গার গৃহহীন হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। সেসময় নৌকাভর্তি শরণার্থীদের সমুদ্রে পুশব্যাক করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ তাদের সীমান্ত সিল করে দেয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় বলেছিলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ঘনবসতির দেশ। আমরা এ ভার বহন করতে পারবো না। ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র ওনচিতা শাদমান বলেন, তারা রোহিঙ্গাদের তালিকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগ এসেছে ২০১২ সালের সহিংসতার পর। শরণার্থী মর্যাদা সম্পন্ন ৩০ হাজার রোহিঙ্গার বেশির ভাগই এসেছে ৭০-এর দশকের শেষে এবং ৯০-এর দশকের শুরুতে। এদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের ওই জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনায়, কোন রোহিঙ্গাকে অবৈধভাবে নিয়োগ, আশ্রয় প্রদান বা পরিচয়পত্র বানিয়ে দিলে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য শাস্তিমূলক নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ফিল রবার্টসন বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক বাংলাদেশীর জন্য ভয়াবহ। কিন্তু এটা রোহিঙ্গাদের জন্য আরও খারাপ। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানো হলে তাদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের মাঝে রেখে তাদের সঙ্গে পিংপং বলের মতো আচরণ করা হচ্ছে। তাদের এদিক থেকে ওদিক ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। যেন কোন প্রকার অধিকারের বালাই নেই।
এদিকে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা নৌকাযোগে অবৈধ ও  ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বাংলাদেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে। এখানে এসে অনেক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান এবং অন্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগ উঠছে নিয়মিত। স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর এক ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ দিদারুল ফেরদৌস বলেন, বৈধ কাজের অনুমোদন না থাকায় তারা অবৈধ কাজে ঝুঁকে পড়ছে। অনেক সময় কম মজুরিতে তারা কাজ করছে আর স্থানীয়রা এ কারণে ক্ষুব্ধ। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ভিত্তিক মানবাধিকার গ্রুপ ফর্টিফাই রাইটসের ম্যাথিউ স্মিথ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হয়েছে গত বছরে। তিনি এ জন্য দুষলেন ত্রুটিপূর্ণ সরকারি কৌশলকে। বাস্তবতা হলো সীমান্তের দু’দিকের কোন দিকেই রোহিঙ্গাদের জন্য তেমন আশার আলো নেই। তবু অনেকে স্বপ্ন দেখেন একদিন তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাবেন।

আসামির সঙ্গে ফোনালাপ ফেঁসে গেল দুই পুলিশ by মহিউদ্দীন জুয়েল

কথিত বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল ৩ আসামিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হোটেলের কক্ষ থেকে সেই বড় ভাইদের ফোন করে পার পায়নি তারা। ফাঁস হয়ে যায় ঘটনাটি। আর সেই ফোনালাপ কেলেঙ্কারির অভিযোগে চট্টগ্রাম পুলিশের দুই সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গত দু’দিন এই বিষয়ে তদন্ত শেষে পুলিশ কমিশনার তাদেরকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এরা হলো  খোরশেদ আলম ও মো. আইয়ুব। দু’জনই পুলিশের কনস্টেবল হয়ে কাজ করছে। অভিযোগ ওঠার পর বুধবার খোরশেদকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গতকাল বরখাস্ত করা হয় আইয়ুবকে। নগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) মাসুদ-উল-হাসান মানবজমিনকে বলেন, ঘটনা সত্যি। বিষয়টি পুলিশ কমিশনার জানার পর বেশ ক্ষুব্ধ হন। এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে শুরু করায় স্যার তদন্ত করার নির্দেশ দেন। শেষমেশ অভিযোগ খতিয়ে দেখে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ। নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৩শে  নগরীর জিইসি মোড়ের হোটেল লর্ডস ইন থেকে জঙ্গি সন্দেহে পাকিস্তানি নাগরিকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাদের মধ্যে একজন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা। গ্রেপ্তারের পরপরই নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার কুসুম দেওয়ান তাদেরকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক করা হয়েছে বলে জানান।
গ্রেপ্তার হওয়া শফিউল্লাহ (৪০) দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি বান্দারবান উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক। এর আগে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ শোনা যায়। তার পিতা ছালেহ আহমদ এক সময় মিয়ানমারের বিছিন্নতাবাদী সংগঠন আরএসও’র সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নাইক্ষ্যংছড়ির প্রভাবশালী এই পরিবারের সঙ্গে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলেও শোনা যায়। এর আগে গত ২১শে নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন পাকিস্তানি নাগরিক আলম। তিনি ব্যবসায়ী পরিচয়ে হোটেল লর্ডস ইনে ওঠেন। হোটেলের কক্ষ বরাদ্দের বই ঘেঁটে দেখা যায়, আলম বিদেশী ব্যবসায়ী পরিচয়ে প্রথমে ৭০১ নং রুম ভাড়া নেন। পরে রুম পরিবর্তন করে নেন পাশের ৭০২ নং কক্ষটি। শফিউল্লাহ আসেন পরদিন রোববার সকালে। এরপর সবাই চলে যান ৬০২ নং কক্ষে। দুপুরের দিকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ টিম ওই হোটেলে হানা দেয়। এই সময় তারা গোপন মিটিং করছিল বলে জানান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাকিস্তানি নাগরিক আলম জানান, তিনি হল্যান্ড ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টার (জিআরসি)-এর পরিচালক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ঘটনার পরপরই পাঁচ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ কমিশনার যৌথ সেল গঠন করেন। তারা তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারেন এই ঘটনায় আরও দুই পুলিশ সদস্য জড়িত। তারা আওয়ামী লীগ নেতাসহ আরও দু’জনকে কয়েকজন রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। আবাসিক হোটেলের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশকে। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআরসি)-এ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে জঙ্গি সন্দেহে পাকিস্তানি নাগরিকসহ গ্রেপ্তার হওয়া ৫ জনকে। এর আগে তাদেরকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আদেশ দিয়েছে আদালত।
এদের মধ্যে গ্রেপ্তার বান্দারবান উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকে নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ আলম, আবদুল মজিদ, মো. আমিন, মো. শফিউল্লাহ ও  মো. ছালামত উল্লাহ। মোহাম্মদ আলম পাকিস্তানি নাগরিক বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে শফিউল্লাহ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক। তিনি সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার প্রসিকিউশন কাজী মুত্তাকি ইবনু মিনান বলেন, আদালতে ১৫ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিচারক সব কিছু শুনে প্রাথমিকভাবে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তাদেরকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এক দশকেও ‘স্বল্পোন্নত’ গণ্ডি পেরোনো অসম্ভব -ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আগামী ১০ বছরেও বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, আগামী এক দশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে মানবসম্পদের উন্নয়ন ও অর্থনীতির বহুমুখীকরণ করতে হবে। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জাতিসংঘের বাণিজ্য সংস্থা ‘আঙ্কটাডের এলডিসি রিপোর্ট-২০১৪’ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এলডিসিভুক্ত ৪৮টি দেশের সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে সারাবিশ্বে একযোগে ওই রিপোর্ট প্রকাশ করে আঙ্কটাড। বাংলাদেশে সংস্থাটির পক্ষে রিপোর্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে সিপিডি।
রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, স্বল্পোন্নতের তালিকা থেকে বের হতে প্রথমে ৬ বছরের জন্য সে দেশকে মূল্যায়ন করা হয়। কারণ দেশটির যে অগ্রগতি, তা কতোটা স্থায়ী না ভঙ্গুর পর্যবেক্ষণ করা হয়। তারপরই সে দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। ২০১৫ সালে যে দেশগুলোকে এভাবে মূল্যায়নের তালিকায় রাখা হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এক দশকেও হবে কিনা সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কিছু ক্ষেত্রে আশঙ্কা দেখছি। ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে আসা সম্ভব। কারণ শুধুমাত্র জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেই মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে পারবে না। আসতে হলে মানবসম্পদ ও অর্থনীতির নাজুকতা সূচকে উন্নয়ন করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, আঙ্কটাডের এইবারের রিপোর্টে উন্নয়নের জন্য প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানিখাত শুধু পোশাক নির্ভর। রপ্তানিকে বহুমুখী করা গেলে অনেক পরিবর্তন আসবে। এই নীতি পরিবর্তন করে প্লাস্টিকসহ আরও সম্ভাবনাময় আর কি খাত আছে তা এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক ব্যক্তি বিবেচনায় কোন খাতের অগ্রাধিকার দিলেও সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি পণ্যে নির্ভর হয়ে পড়ছে, এটা অবকাঠামোকে দুর্বলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য যেসব সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে সেগুলোতে অবকাঠামো সহায়তা দিতে হবে। উৎপাদন খাত আরও সহায়তা দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক সূচকে এগুলোও কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃষি থেকে বের হয়ে উৎপাদনভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের মানবসম্পদ কৃষি থেকে সরে এসে সেবা খাতের দিকে যাচ্ছে। শিল্পখাতে উৎপাদন বাড়লেও মানুষের আয় ও জীবনমান বেড়ে যাবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতা উন্নয়ন করে এলডিসি থেকে সহজে বের হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয় শিল্পনীতি ও সক্ষম মুদ্রানীতি। দেশে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় অন্যদের তা দেয়া হয় না। শুধু প্রভাবশালীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সম্ভাবনাময় খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার খাতে নীতি-সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। রাজস্ব আয় ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের দিকে নজর দিতে হবে।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন সিপিডি’র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
মূল প্রতিবেদন প্রকাশকালে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলো দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর যে অগ্রগতি হয়েছিল তাতে ভাটা পড়েছে। এই দুষ্ট চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ২০১৫ পরবর্তী পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিতে হবে। কৃষিখাত থেকে শ্রমিক বের করে শিল্পখাতের দিকে নিয়ে যেতে হবে। কৃষিখাত থেকে শ্রমিক বের করে যত বেশি শিল্পখাতে ব্যবহার করা যাবে উৎপাদনশীলতা তত বাড়বে।
গবেষণা তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ২০১৫ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মাথাপিছু আয় ১,২৪৩ ডলার হতে হবে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৯০০ ডলার। বর্তমানে ৯৯২ ডলার। ২০১৫ সালে এটি বেড়ে ১০৩৫ ডলার হতে পারে। মানবসম্পদ উন্নয়নসূচক ৬৬ হতে হবে। তবে ২০১৫ সালের মধ্যে এই সূচক বড়জোর ৬০ হতে পারে। সুতরাং ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। ২০১৫ সালের মধ্যে যে দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলে জাতিসংঘ বলছে, তার মধ্যেও বাংলাদেশের নাম নেই।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এমডিজি’র যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা খুব কমসংখ্যক দেশ অর্জন করতে পারবে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ পরবর্তী যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করতে না পারলে এসডিজি’র (স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, স্বল্প সুদে যে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে স্বল্প আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে আসলে তা বাণিজ্যিক সুদে নিতে হবে। তবে এখনই অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সুদে ঋণ নিচ্ছে। তাই স্বল্প আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে আসলে ঋণ পেতে যে অসুবিধা হবে, এমন ধারণা ঠিক না।

প্রশ্নপত্র ফাঁসে হাত দিলে পুড়ে যাবে: শিক্ষামন্ত্রী by নুর মোহাম্মদ

প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে অধিদপ্তরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন>> প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী পরীক্ষার প্রায় সব প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মাধ্যমে। গত রোববার থেকে সারা দেশে শুরু হওয়া এই পরীক্ষার পাঁচটি বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলেছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুকসহ সব জায়গায়। ঠিক এই সময় এটির পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন দুই মন্ত্রী। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের জানান, জাতিকে ধ্বংস করার কাজে যারা নেমেছে তাদের হাত ভেঙে দেয়া হবে। প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে না পারলে প্রয়োজনে পরীক্ষার দিন মোবাইল, ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হবে। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কোন জেলায়ই প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ নেই। এ ধরনের সংবাদকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি। তিনি বলেন, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে প্রমাণ করতে পারলে এর দায় নিজের কাঁধে তুলে নেবো। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর একই মত প্রকাশ করে বলেন, পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর স্রেফ গুজব। আজ পর্যন্ত একটা পরীক্ষার প্রশ্নও মিলেনি। ফেসবুকের পেজগুলো বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছি। মামলার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। আর যেহেতু প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়া যায়নি তাই আপাতত কোন তদন্ত কমিটি করা হচ্ছে না। শিক্ষাবিদরা বলছেন, গত তিন বছর ধরে প্রশ্ন ফাঁস একটি শঙ্কার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি রোধ করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে প্রায় ৩১ লাখ ক্ষুদে শিক্ষার্থী। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষাসহ অন্যান্য ম্যানেজমেন্ট করার সক্ষমতা নেই এই পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (ন্যাপ)’র। তাই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর বিষয়ে এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না অভিভাবকরা।
কর্মকর্তা বলছেন, গত বছরের পিএসসি পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত কমিটি বাংলায় ৫৩ এবং ইংরেজি বিষয়ে ৮০ শতাংশ প্রশ্ন ফাঁস হয় বলে প্রমাণ পায়। তদন্ত কমিটি প্রশ্নপত্র প্রণয়নে ‘আমূল’ পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। সেখানে বিজি প্রেসের কাগজ শনাক্ত করার জন্য সফটওয়্যার ব্যবহার করতে বলা হয়। প্রশ্ন তৈরি ও বিতরণে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করার সুপারিশও করে তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে না নিয়ে এ বছর সনাতন পদ্ধতিতেই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, গত বছর একই অভিযোগ আমরা শুনেছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি ছাড়া প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে কার্যত কোন উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এটি বন্ধ করা সম্ভব মন্তব্য করে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জোরালো উদ্যোগের ফলে এবার জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ফেসবুকের সাজেশন আকারে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন যদি মূল প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায় তবেই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। পরীক্ষা বাতিল বা নতুন প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এখনই বলা যাবে না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
ধর্ম শিক্ষার প্রশ্নও ফাঁস: আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ বিষয়ের প্রশ্নপত্রের হুবহু মিলেছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানিয়েছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকরা জানান, আগের রাতে ও পরীক্ষার দিন সকালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ‘নমুনা’ প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নের কপি মিলে গেছে। তারা বলেন, ‘নমুনা’ প্রশ্নে পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা ও প্রশ্ন নাম্বার দেয়া ছিল। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর এক পরীক্ষার্থী জানান, তার গৃহশিক্ষক আগের রাতে যে সব প্রশ্নের সমাধান পড়িয়েছেন; পরীক্ষায় সেগুলোই এসেছে। তার পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর জেএসসি প্রশ্ন ফাঁসের পর এবার সারাদেশের ৮টি শিক্ষা বোর্ডের জন্য ৩২ সেট প্রশ্নপত্র তারা প্রণয়ন করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখান থেকে লটারি করে বোর্ডওয়ারি প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। তাই এবার জেএসসিতে প্রশ্ন ফাঁসের কোন অভিযোগ ওঠেনি। অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তেমন কোন ব্যবস্থা না নিয়েই পিএসসি পরীক্ষা নেয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, প্রতিবছর এসএসসিতে প্রায় ১৩-১৪ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এ পরীক্ষার জন্য সারা দেশে মোট দশটি বোর্ড কাজ করে। সে হিসাবে প্রতিটি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় লাখের কিছু বেশি। এসব পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নিতেই বোর্ডকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। অথচ দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা পিএসসি’র ৩১ লাখ পরীক্ষার্থীর জন্য কোন বোর্ড নেই। অথচ ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে এই পরীক্ষা।
সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় অগ্রসর হয়নি বোর্ড গঠনের কাজ। কবে হতে পারে তা-ও মন্ত্রণালয় বলতে পারছে না। তবে সম্ভাব্য ব্যয় ও জনবল কাঠামো কি হবে সে বিষয়ে খসড়া তৈরির জন্য ন্যাপকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় যেভাবে: প্রাথমিক সমাপনীর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয় ময়মনসিংহে অবস্থিত ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্রাইমারি এডুকেশন (ন্যাপ) কার্যালয়ে। সেখান থেকে অনেকটা অরক্ষিতভাবেই প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। এখান থেকেই কেউ কেউ প্রশ্ন ফাঁসের নেপথ্যে কাজ করে। বিজি প্রেসের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই হাত করে দেশের কোচিং সেন্টারগুলো নানা সময় জড়িয়ে পড়ে এই অপকর্মে। কিছু অর্থলোভী শিক্ষকও প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বলে প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজি প্রেসের গোপনীয় শাখার প্রুফ রিডিং সেকশনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র মুখস্থ বিদ্যার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। একটি প্রশ্নপত্র কয়েকজন মিলে ভাগ করে তা মুখস্থ করে। অনেক সময় এখানকার কেউ কেউ আন্ডারওয়্যারের ভেতর লুকিয়ে প্রশ্নপত্র বাইরে সাপ্লাই করে। মূলত এখান থেকেই শুরু। এরপর এখান থেকে মুঠোফোন, ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কোথাও কোথাও ফটোকপি করেও বিক্রি হয়। এরপর এটা নিয়ে চলে প্রশ্ন বাণিজ্য। পরীক্ষা শুরুর আগ পর্যন্তই বিক্রি হতে থাকে প্রশ্নপত্র। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবার প্রশ্নপত্র বিজি প্রেসে ছাপানোর পর সিলগালা করে ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্রাইমারি এডুকেশন (ন্যাপ)-এর কর্মকর্তার উপস্থিতিতে প্যাকেটবদ্ধ ও গণনা করে নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে জেলাওয়ারি পাঠানো হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজ জেলার ট্রেজারিতে তা সংরক্ষণ করেন। জেলা কমিটি থেকে প্রশ্নপত্র উপজেলায় পাঠানোর পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিলগালাযুক্ত প্রশ্নপত্র সোনালী ব্যাংক বা থানায় সংরক্ষণ করেন। জেলার ক্ষেত্রে প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা এবং মহানগরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় এ সব প্রশ্নপত্র। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এবার পিএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী, বগুড়া, যশোর, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের বড় বড় জেলা থেকে ফেসবুকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ও পেজ খুলে সেখানে প্রশ্ন তুলে দেয়া হয়েছে। পেজগুলোয় লেখা থাকে, এটা প্রশ্ন নয়, সাজেশন। তবে সাজেশন শতভাগ মিলে যাবে। আগাম প্রশ্নপত্র আপলোড করা একাধিক ফেসবুক পেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিএসসি পরীক্ষার আগের রাত ১০টা থেকে সেখানে প্রশ্নপত্র দেয়া হয়।

এই আরিফই কি সেই আরিফ? by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা ঘটনায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর আসলেই কোন প্রকার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা নিয়ে রহস্য কাটছেই না। এ ঘটনায় এতদিন পর্যন্ত তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কোন আলোচনা না থাকলেও হঠাৎ করেই এ মামলার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন তিনি। চার্জশিট পর্যালোচনায় এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, মামলায় অভিযুক্ত আরিফই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কিনা। তদন্ত কর্মকর্তাও তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। এ নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই যে বিভ্রান্ত তার প্রমাণ মিলেছে আরিফের নামের বানানে। আরিফের নামের পূর্ণ রূপটি ব্যাপক পরিচিত হলেও অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা আরিফুল হক চৌধুরী নয় নাম উল্লেখ করেছেন আরিফুল ইসলাম চৌধুরী হিসেবে। অবশ্য ঠিকানা উল্লেখ করেছেন আরিফুল হক চৌধুরীরই।
কিবরিয়া হত্যা মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি সিলেট অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মেহেরুন্নেসা পারুল চার্জশিটে সিটি মেয়র আরিফের নাম সংযুক্ত করলেও কোন শক্ত ভিত্তি দাঁড় করাতে পারেননি। আরিফের সঙ্গে চার্জশিটে নতুন করে সংযুক্ত আরও একটি নাম হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র গোলাম কিবরিয়া জিকে গউছ। দু’জনকেই মাত্র একটি স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যে স্বীকারোক্তিটি নেয়া হয়েছিল অন্য এক মামলায়। কিবরিয়া হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মুফতি হান্নান ২০১১ সালের ৭ই এপ্রিল ঢাকার মতিঝিল থানার মামলায় (নং ৯৭(০৮)২০০৪) যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন সে স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আরিফ-গউছকে জড়ানো হয়েছে কিবরিয়া হত্যা মামলায়। তবে মুফতি হান্নান একই বছরের ২৭শে সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১-এ তার এ স্বীকারোক্তিটি প্রত্যাহারের আবেদনও করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা যে মামলায় স্বীকারোক্তির বিষয়টি উল্লেখ করেন সেটি ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরণ আইনে দায়ের করা মামলায়, কিবরিয়া হত্যা মামলায় নয়। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা প্রসঙ্গে মুফতি হান্নানের একটি জবানবন্দি রয়েছে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির নির্মিত তথ্যচিত্র ‘জিহাদের প্রতিকৃতি’তে। তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে যে বৈঠকটির কথা বলেছেন এর উল্লেখও আছে সে জবানবন্দিতে। তবে মুফতি হান্নান সে জবানবন্দিতে আরিফুল হক চৌধুরী ও জিকে গউছের নাম উল্লেখ করেননি তবে জনৈক আরিফুল ইসলাম আরিফের নাম উল্লেখ করেন। তদন্ত কর্মকর্তাও মামলার চার্জশিটে আরিফুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন কিন্তু কৌশলে চিহ্নিত করেছেন আরিফুল হককেই। তদন্ত কর্মকর্তার বর্ণনামতেই এ বৈঠকটি হয়েছিল কিবরিয়া হত্যার এক বছরেরও আগে। এত পেছনের একটি সাক্ষাতের সূত্র ধরে কিবরিয়া হত্যা ঘটনায় আরিফ-গউছকে জড়ানো যৌক্তিক হয়নি বলেই অনেকের মন্তব্য। চার্জশিটে মুফতি হান্নানের পুরনো একটি স্বীকারোক্তির বাইরে আরিফ-গউছের বিরুদ্ধে আর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা।
অনেকেরই সন্দেহ, তদন্ত কর্মকর্তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা কারও ইশারায় আরিফুল হক চৌধুরীর নাম মামলায় জড়িয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, চার্জশিটের পরতে পরতে বিভ্রান্তির ছোঁয়া রেখে দিয়েছেন সিআইডির এ কর্মকর্তা। আরিফুল হকের নামের বানান ভুল রেখেছেন, আর ঠিকানা ভুল রেখেছেন জিকে গউছের। পাশাপাশি চার্জশিটে আরিফুল হক চৌধুরী ও জিকে গউছকে পলাতক দেখিয়েও বিভ্রান্তির জাল আরও মজবুত করেছেন। অথচ আরিফুল হক ও জিকে গউছ দু’জনেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিবরিয়া হত্যা ঘটনার অনেক পরে নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে এবং জিকে গউছ হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি সিটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আরিফুল হক বেশ ক’বার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন। সরকারি সফরে দেশের বাইরেও ঘুরে এসেছেন। জিকে গউছও হবিগঞ্জে মেয়র হিসেবে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। তাদেরকে কিসের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা পলাতক চিহ্নিত করলেন তার কোন ব্যাখ্যা নেই চার্জশিটে।
২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ-পরবর্তী জনসভা শেষে বের হওয়ার পথে গ্রেনেড হামলার শিকার হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়ার পর মারা যান তিনি। গ্রেনেড হামলায় আরও পাঁচজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মজিদ খান বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দু’টি মামলা করেন। ২০০৫ সালের ১৯শে মার্চ এ মামলায় তদন্ত শেষে প্রথম চার্জশিট দিয়েছিলেন সিআইডির (সিটি জোন, উত্তর, ঢাকা) এএসপি মুন্সী আতিক। চার্জশিটে ১০ জনকে অভিযুক্ত করেন তিনি। বাদীপক্ষ তাতে আপত্তি জানালে নতুন করে তদন্ত শুরু হয় এ মামলার। অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২০শে জুন দ্বিতীয় দফা চার্জশিট দাখিল করেন সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হবিগঞ্জ জোন) মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি নতুন ১৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে আগের অভিযুক্তদের অব্যাহতি প্রার্থনা করেন চার্জশিটে। চার্জশিটে সন্তুষ্ট না হওয়ায় আবারও আপত্তি জানান কিবরিয়া পরিবার। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে নতুন করে মামলার তদন্তভার দেয়া হয় সিলেট অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মেহেরুন্নেসা পারুলের ওপর। গত ১২ই নভেম্বর সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন সিআইডির এ কর্মকর্তা। আগের দুই চার্জশিটে অভিযুক্তদের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাবেক একান্ত সচিব হারিছ চৌধুরী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জের সাবেক মেয়র গোলাম কিবরিয়া গউছসহ নতুন আরও ১১ জনকে যুক্ত করেন তিনি। অব্যাহতি চান তিনজনের।
দু’দফা আপত্তির পর এ চার্জশিটকে মেনে নিয়েছেন শাহ এএমএস কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া। এক বিবৃতিতে চার্জশিটকে কিবরিয়া-পত্নী ‘মোটামুটি গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, ‘প্রকৃত হত্যাকরী ও মদতদাতাকারী, সহায়তাকারীদের নাম মোটামুটি চলে এসেছে।’ তবে হবিগঞ্জের সে সময়কার জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হকের নাম না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। বিবৃতিতে দ্বিতীয় চার্জশিট প্রদানকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, রফিকুল ইসলাম প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে চেয়েছিলেন। এমনকি মামলার বাদী এডভোকেট আবদুল মজিদ খানের প্রতিও অপরাধীদের আড়াল করার একই অভিযোগ উত্থাপন করেন আসমা কিবরিয়া। অভিযুক্ত করেন বর্তমান পিপি আকবর হুসেনকেও। তিনি তিনজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করার আহ্বানও জানান।
মানবজমিনের কথা হয় বাদীপক্ষের আইনজীবী আলমগীর ভূঁইয়া বাবুলের সঙ্গে। তিনি নিশ্চিত করেন চার্জশিটে আর কোন আপত্তি না দেয়ার সিদ্ধান্তই হয়েছে। সিনিয়র এ আইনজীবী বলেন, সর্বশেষ চার্জশিটে প্রত্যাশার অনেকাংশই প্রতিফলিত হওয়ায়ই নারাজি দিয়ে আর মামলাকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন না শাহ এএমএস কিবরিয়ার পরিবার। তাকে মামলা এগিয়ে নেয়ারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

লন্ডনে বাংলাদেশ বিষয়ক সেমিনার- গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংলাপের তাগিদ by তানজির আহমেদ রাসেল

নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে লন্ডনে আয়োজিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক সেমিনারে। এতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতারা অংশ নেন। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে সরকার সফলভাবে দেশ পরিচালনা করছে বলে দাবি করেন। বুধবার হাউস অব লর্ডসে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ: স্বাধীনতার ৪৩ বছর, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার হুমকি’ শীর্ষক সেমিনারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। ৫ই জানুয়ারি একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জন সংসদ সদস্য নিয়ে তারা নিজেরাই ক্ষমতা গ্রহণ করেছে তাই এই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অভাব দূর করতে সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে দ্রুত সংলাপ জরুরি। পার্লামেন্টারি হিউম্যান রাইটস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লর্ড অ্যাভবুরির সভাপতিত্বে সেমিনারে কো-চেয়ার ছিলেন অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান এ্যান মেইন এমপি। সেমিনারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন এমপি, তারানা হালিম এমপি, যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার আবদুল হান্নান। বিএনপির পক্ষে আরও বক্তব্য রাখেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সঞ্জীব চৌধুরী। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আব্বাস ফায়েজ ও ক্যাম্পেইন ফর প্রটেকশন অব রিলিজিয়াস মাইনোরিটিস ইন বাংলাদেশের পুষ্পিতা গুপ্ত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপিকে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিলো কিন্তু বিএনপি সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন (সিপিএ) ও ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়নে (আইপিইউ) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এই সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন। ডেমোক্রেটিক ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০ শতাংশ  ভোটাধিকার প্রয়োগ হয়েছে বলে তিনি সেমিনারে জানান। বিগত জোট সরকারের সময়ে শাহ এএমএস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা, জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, মন্দির জ্বালিয়ে দেয়ার বিষয় উল্লেখ করে এইচ টি ইমাম বলেন, বর্তমান সরকার উগ্রপন্থা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও  মৌলবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে সংসদে সেটা বাতিল হয়েছে।
পার্লামেন্টারি হিউম্যান রাইটস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান লর্ড অ্যাভবুরি সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় উগ্রপন্থা, জঙ্গিবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করার সুযোগ নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে  ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবাধিকার সমুন্নত  রাখা এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থায় সকলের সমান অধিকারের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আব্বাস ফয়েজ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মত প্রকাশে স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পত্রিকার সম্পাদক ও  টেলিভিশন মালিকদের সরকারি বাহিনী নানা রকম হুমকি দিচ্ছে। টকশোতে কারা যেতে পারবেন, কি বিষয়ে আলোচনা করা যাবে, সেটাও সরকার ঠিক করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ২০১২ থেকে এ পর্যন্ত তারা ২০টি গুমের তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ১১ জন নিখোঁজ ও ৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারসহ  বিভিন্ন নিখোঁজ ও গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ক্যাম্পেইন ফর প্রটেকশন অব রিলিজিয়াস মাইনোরিটিস ইন বাংলাদেশের পুষ্পিতা গুপ্ত বিগত সময়ে  জামায়াত-শিবির কিভাবে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছিল তার একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের জন্য জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করে ২০১৪ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি সুন্দরগঞ্জের ঘটনার বর্ণনা দেন। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা হুমকির মুখে বলেও তিনি মত দেন।
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেন, সারা বিশ্ব চরম মন্দার মধ্যে থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬-৭ এর মধ্যে আছে। আমাদের জিডিপি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ  চৌধুরী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি বলেছেন, তিনি নিজে তদারক করে নিজেদের দলীয় পুলিশ বাহিনী দিয়ে  ভোটের কাজ করেছেন। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভোটের সময় তাদের জন্য উজাড় করে দিয়েছে। তার এমন বক্তব্যই প্রমাণ করে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুলতান শরীফ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক, সহ-সভাপতি সৈয়দ জালাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা প্রশান্ত বড়ুয়া, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুছ, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল হামিদ চৌধুরী, কনজারভেটিভ পার্টির এমপি পদপ্রার্থী মিনা রহমান, সাংবাদিক শাহিদা সৈয়দ প্রমুখ।

ঢাকায় নিশা দেশাই- খালেদার সঙ্গে বৈঠক আজ

ঢাকা সফর শুরু করেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। গতকাল থেকে তার তিন দিনের সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে দু’দিন কাঠমান্ডু ছিলেন মার্কিন ওই কর্মকর্তা। গতকাল তিনি ঢাকায় আসেন। একাধিক কূটনৈতিক সূত্রমতে সফরের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে আজ ও আগামীকাল সরকারের প্রতিনিধি, সংসদের বিরোধী দলের নেতা, সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ, এনজিও প্রতিনিধি এবং শ্রম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হবে তার। কাল ঢাকা ছাড়ার আগে গণমাধ্যমের মুখোমুখিও হবেন তিনি। এদিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশা দেশাই বিসওয়ালের সফরসূচি প্রকাশ করেছে। দূতাবাস জানিয়েছে, ২৭-২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন তিনি। তিন দিনের সফরে তিনি সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক সমপ্রদায়, তৈরী পোশাক শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ ও কর্মী এবং বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকায় তার কার্যক্রম ছাড়াও তিনি গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) সফর করবেন। তিনি ২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। নিশা দেশাই বিসওয়াল ২০১৩ সালের ২১শে অক্টোবর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং তাজিকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি “ইউএসএআইডি” এশিয়ার সহকারী প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি মধ্য এশিয়া থেকে প্যাসিফিক আইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ২২টি দেশের সহায়তায় ১২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল, একটি দপ্তরের ব্যবস্থাপনা এবং ১২শ’রও বেশি উন্নয়ন কর্মীর  দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।  তার দায়িত্ব পালনকালে সময়ে ইউএসএআইডি বার্মায় এর কার্যক্রম পুনরায় চালু করে এবং ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কাজাখস্তানের মতো  দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতায় সম্মিলিত কর্মসূচির মাধ্যমে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।
খালেদা-নিশা বৈঠক আজ সন্ধ্যায়: এদিকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন ঢাকা সফররত মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। আজ সন্ধ্যা ৬টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।  বিএনপি কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের তথ্য-প্রমাণ ও নিজের অবস্থানের যৌক্তিকতাসহ বিভিন্ন বিষয় মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবে বিএনপি। এছাড়া গত ১৩ই নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্যের ভিডিওচিত্র ও পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করবে তারা। এছাড়া যখনই কোন বিদেশী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাংলাদেশে আসেন, তার আগ মুহূর্তে দেশে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যাতে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে বলে প্রমাণ করা যায়। এই জঙ্গিবাদ কেবল এই সরকারই দমন করতে পারবে বলে বিদেশেীদের বোঝাতে চায়। সর্বশেষ নিশা দেশাইয়ের বাংলাদেশ সফরের আগ মুহূর্তে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে কটূক্তির দায়ে মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ থেকে অপসারিত লতিফ সিদ্দিকীকে দেশে ফিরিয়ে সরকার এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করবে বিএনপি। এছাড়া, ২০১৩ সালে নভেম্বরে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে আলোচনার মাধ্যমে খুব দ্রুতই সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছিল আওয়ামী লীগ। তবে সেই নির্বাচনের পর তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এমনকি সংলাপের বিষয়টিও অস্বীকার করছে। এ বিষয়গুলো তারা মার্কিন এই কূটনীতিকের কাছে তুলে ধরবে। মার্কিন এই মন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে গত মঙ্গলবার গুলশান কার্যালয়ে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা। এতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে এসব তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
রওশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে: দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা  দেশাই বিসওয়াল বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। রওশনের গুলশানের বাসায় আজ বিকাল সাড়ে ৪টায় এ বৈঠক হবে বলে বিরোধীদলীয় নেতার তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মামুন হাসান গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন।

৩৬ দফা কাঠমাণ্ডু ঘোষণা -সার্ক জ্বালানি চুক্তি সই

কর্মকর্তা পর্যায়ে সিরিজ আলোচনায় ‘ঐকমত্য’ না হওয়ায় সার্ক কাউন্সিল অব মিনিস্টারস্‌-এ মুখ্য এজেন্ডা হয়ে উঠেছিল জ্বালানি সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়মিত আলোচনায়ও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। বাংলাদেশ ও ভারত আগাগোড়াই ইতিবাচক থাকলেও ভিন্নমত ছিল পাকিস্তানের। অন্য ৫ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ছিলেন নীরব। মধ্যরাতে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসেন দক্ষিণ এশিয়ার ৮ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। কিন্তু এক সদস্য গররাজি হওয়ায় আলোচনা ভেঙে যায়। উদ্বোধনী দিনে সর্বোচ্চ নেতাদের উপস্থিতিতে চুক্তিটি সইয়ের সময়ক্ষণ ঠিক ছিল। সেই সূচি বাতিল করেন আয়োজক রাষ্ট্র নেপালের প্রধানমন্ত্রী। মুহূর্তেই নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বগণমাধ্যমে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে এক অবকাশ বৈঠকে বসেছিলেন নেতারা। সেখানেই ঘটে নাটকীয়তা। সব টানাপড়েন পেছনে ঠেলে পাকিস্তানসহ সার্কের শীর্ষ নেতারা জ্বালানি সহযোগিতা সমপ্রসারণ চুক্তি সই করতে রাজি হন। ওই অবকাশ বৈঠকে অবশ্য অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অংশ নিতে পারেনিনি। তার প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও সচিব অংশ নেন। পূর্বনির্ধারিত কোন সূচি না থাকলেও গতকাল সমাপনী অনুষ্ঠানেই চুক্তিটি সই করেছেন সার্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। কাঠমান্ডু ঘোষণার আগেই চুক্তিটি সই হয়। বাসস জানিয়েছে, ওই চুক্তির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জোট সার্ক-এর সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ গ্রিড নির্মাণ করতে পারবে। এর মধ্য দিয়ে সার্ক বিদ্যুৎ বাজারের ক্ষেত্র তৈরি হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আট দেশের শীর্ষ  নেতাদের উপস্থিতিতে পরররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই চুক্তিতে সই করেন। ওই চুক্তি ও ৩৬ দফা্‌ কাঠমান্ডু ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাঠমান্ডুর রাষ্ট্রীয় সভাগৃহে গতকাল সার্কের ১৮তম আসরের পর্দা নেমেছে।
চুক্তি স্বাক্ষর শেষে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্ভাবনাময় দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে যোগাযোগ উন্নয়নসহ একই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সন্ত্রাস দমনসহ নিরাপদ এশিয়া গড়ার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। গত ২১শে নভেম্বর কাঠমান্ডুতে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নিবিড় সংহতি’- এই প্রতিপাদ্যে শুরু হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংস্থার এ সম্মেলন। সার্কের আট নেতার উপস্থিতিতে বিদায়ী চেয়ারম্যান মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম সম্মেলন উদ্বোধন করেন। সার্ক রীতি অনুযায়ী দায়িত্ব নেন স্বাগতিক দেশ নেপালের প্রধান মন্ত্রী সুশীল কৈরালা।
অবকাশ কর্মসূচিতে যোগ দেননি প্রধানমন্ত্রী, দেশে ফিরছেন আজ: ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতার কারণে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশ কর্মসূচিতে অংশ নেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে আসা সার্কের শীর্ষ নেতাদের জন্য গতকাল সকালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ধুলিখেলে এই অবকাশের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতার কারণে প্রধানমন্ত্রী ধুলিখেলে যেতে পারেননি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, শ্রীলঙ্কার  প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আব্দুল গাইয়ুম, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি সকালে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডু থেকে ধুলিখেলে যান। নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালাও এ সময় সার্ক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ছিলেন। সেখান থেকে কাঠমান্ডু শহরে ফিরে সার্ক সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা সম্মেলনের সমাপনী সভায় অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পর্বে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে অংশ নিতে মঙ্গলবার বিকালে নেপালে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বুধবার সকালে কাঠমান্ডুর ‘রাষ্ট্রীয় সভাগৃহে’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সব মতপার্থক্য সরিয়ে যৌথ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে আসার জন্য সার্ক নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সম্মেলনের মূল আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বুধবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা এবং আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন তিনি। সম্মেলনের সমাপনীর পর বৃহস্পতিবার রাতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের  সৌজন্যে নেপালের প্রেসিডেন্ট রামবরণ যাদবের দেয়া নৈশভোজে যোগ দেন শেখ হাসিনা। আজ তিনি দেশে ফিরছেন।
৩৬ দফা কাঠমান্ডু ঘোষণা
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ৩৬-দফা কাঠমান্ডু ঘোষণার মাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-র ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা সন্ধ্যায় সিটি হলে এ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাপনী অধিবেশনে সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। কৈরালা ঘোষণা করেন, ১৯তম সার্ক সম্মেলনে ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনে যুগান্তকারী সার্ক ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন এনার্জি কো-অপারেশন (বিদ্যুৎ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হলো। ৮ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সমাপনী অধিবেশনে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তেশেরিং তোবগে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা সিটি হলে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, সদস্য দেশের পরিবহন মন্ত্রীরা সার্ক যাত্রী পরিবহন মোটরযান চুক্তি ও সার্ক রেলওয়ে সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য আগামী ৩ মাসের মধ্যে বৈঠকে বসবেন। সুশীল কৈরালার সমাপনী ভাষণের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ধন্যবাদ জানান। পরে দক্ষিণ এশিয়ার ৮ দেশের শীর্ষ নেতারা এক ফটোসেশনে অংশ নেন।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানলেন ফিলিপ হিউজ

দু’দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ। বৃহস্পতিবার সিডনির একটি হাসপাতালে চিকিৎ?সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২৬ টেস্ট ও ২৫ ওয়ানডে খেলা এই ক্রিকেটারের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর ৩৬২ দিন। আগামী ৩০শে নভেম্বর ছিল তার জন্মদিন। ১৯৮৮ সালের ওই দিনে তিনি নিউ সাউথ ওয়েলসের ম্যাকসভিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২৫শে নভেম্বর মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া লীগ শেফিল্ড শিল্ডে নিউ সাউথ ওয়েলসের বোলার শন অ্যাবটের বাউন্সে মারাত্মক আঘাত পান ফিল হিউজ। মাথায় হেলমেট পরা থাকলেও বলটি হেলমেটের নিচে তার ঘাড়ের ওপরের দিকে আঘাত হানে। মাথার খুলি ফেটে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাঁহাতি এ ব্যাটসম্যান সঙ্গে সঙ্গে মাঠে সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যান। তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকাল ২টা ২৩ মিনিট। এরপর তাকে হাসপাতালে নিতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। দ্রুত হেলিকপ্টারযোগে তাকে সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দু’দিন অচেতন থেকে মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরণ করেন তিনি। মাঠে ৬৩ রানে অপরাজিত থাকলেও মৃত্যুর কাছে পরাস্ত হলেন তিনি। হাসপাতালে নিবিড়-পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও ফিরতে পারলেন না তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ঘটনার নায়ক হয়ে মৃত্যুর কাছে হেরে যান তিনি। সিডনির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেড় ঘণ্টার অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তার মস্তিষ্কে। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচারটা কোন কাজেই আসেনি তার। মৃত্যুর সময় হিউজের সঙ্গে ছিলেন তার বাবা-মা গ্রেগ ও ভার্জিনিয়া, বোন মিগান ও ভাই জেসন ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। এছাড়া, তার সতীর্থ ও অসংখ্য ক্রিকেটানুরাগী হাসপাতালের বাইরে সর্বশেষ খবর জানার জন্য অধীর আগ্রহে অবস্থান করছিলেন। সাবেকদের মধ্যে রিকি পন্টিংও ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। তার মৃত্যুতে নিউ সাউথ ওয়েলসে শেফিল্ড শিল্ডের পরের রাউন্ডের খেলাগুলোও বাতিল করা হয়েছে। ২০০৯ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে তার টেস্ট অভিষেক হয়। ২৬ টেস্টে ৩২.৬৫ গড়ে ১৫৩৫ রান করা এই ক্রিকেটারের আছে তিনটি সেঞ্চুরি আর সাতটি ফিফটি। অভিষেক সিরিজেই ডারবানে পরপর কনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি সেঞ্চুরি করে দারুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন হিউজ। ওয়ানডেতেও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। তবে ফর্মের ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে অস্ট্রেলীয় দলে নিয়মিত হতে পারেননি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১১৪ খেলায় ২৬টি সেঞ্চুরিসহ ৯ হাজারের ওপর রান ছিল তার। গড় ছিল ৪৬.৫১। আর ঘরোয়া সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তার গড় ছিল ৪৭.২৫। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্ট সিরিজেও দারুণ খেলেন তিনি। কাউন্টি ক্রিকেটে হ্যাম্পশায়ার, মিডলসেক্স ও ওরস্টারশায়ারে খেলা হিউজ নটিংহ্যাম টেস্টে ১০ম উইকেটে অ্যাস্টন অ্যাগারের সঙ্গে রেকর্ড ১৬৩ রানের ইনিংসও খেলেন। সে ইনিংসে তিনি অপরাজিত ছিলেন ৮১ রানে। হিউজ ভারতের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজে নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন। অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের চোট তার দলে ফেরা মোটামুটি নিশ্চিতই করে দিয়েছিল। সামপ্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ ফর্মেই ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনা  শেষ অবধি তাকে নিয়ে গেল সব জাগতিক আশা-আকাঙক্ষা আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ঊর্ধ্বেই। এর আগে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে আবাহনীর খেলার সময়  ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটার রমন লাম্বা ফিল্ডিং করার সময় মেহরাব হোসেন অপির খেলা বলে আঘাত পেয়ে মারা যান। তবে গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সময়ও একজন প্রাণ হারান বলের আঘাতে।
শোকের ছায়া বিশ্বজুড়ে
মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সারা ক্রিকেটবিশ্বে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকালে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে চিকিৎসক পিটার ব্রুকনার যখন তার মৃত্যুর ঘোষণা দেন তখন তা সিএনএন ও বিবিসি’র মতো টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও সরাসরি সমপ্রচার করে। হিউজের মৃত্যুর কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় অনুষ্ঠানরত পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড তৃতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা বাতিল করে দেয়া হয়। খেলা শুরুর ঘণ্টা দেড়েক হিউজের খবর পৌঁছার পর প্রথমে এক ঘণ্টা বিলম্বে খেলা শুরুর চিন্তা করা হলেও পরে পুরো দিনের খেলাই পিছিয়ে দেয়া হয়। খেলার সময় একদিন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া, অস্ট্রেলিয়া সফররত ভারত ও অস্ট্রেলিয়া বোর্ড একাদশের মধ্যে অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠেয় দু’দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটিও বাতিল করে দেয়া হয়। আগামী ৪ঠা ডিসেম্বর ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়া-ভারত প্রথম টেস্ট শুরু হওয়ার কথা। আইসিসি সভাপতি শ্রিনিবাসন, বাংলাদেশ বোর্ড প্রধান নাজমুল হাসান অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমসহ সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের প্রধানেরা শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটাররা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়া দলে অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক হিউজের মৃত্যুর খবর যখন ঘোষণা করেন তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সাত খুনে তারেক-আরিফ সরাসরি জড়িত :র‌্যাব-এর তদন্ত প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জড়িত ছিলেন র‌্যাব-এর সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেন। র‌্যাব-এর তদন্ত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। রোববার  এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আগামী ১০ই ডিসেম্বর হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে। বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ প্রতিবেদন উত্থাপন করা হবে। র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করে কাউন্সিলর নূর হোসেন। এ ঘটনার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ অপহরণ থেকে শুরু করে নদীতে লাশ ডোবানো পর্যন্ত লে. কর্ণেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর আরিফ হোসেন জড়িত ছিলেন। তবে লে. কমান্ডার এম এম রানা অপহরণ পর্যন্ত অংশ নিয়ে আংশিক জড়িত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাত জনকে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাবের এসআই পূর্ণেন্দ্র বালা, এবি আরিফ হোসেন, নায়েক নাজিম (ড্রাইভার), নায়েক দেলোয়ার (ড্রাইভার) ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সি, আব্দুল আলীম, আলামিন, তৈয়ব, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন, আলামিন, হাবিলদার এমদাদ, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সৈনিক আসাদ, সার্জেন্ট এনামুল, এএসআই বজলু, হাবিলদার (ড্রাইভার) নাছির, সৈনিজ তাজুল পুরো সময় উপস্থিত ছিলেন। তদন্তে দেখা যায়, র‌্যাব ১১-এর অধস্তন সদস্যগণ ঘটনাপ্রবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের সরকারী দায়িত্ব মনে করে থাকতে পারেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তারা প্রাণের ভয়ে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেদের জড়িত রেখেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাত জনকে গত ২৭শে এপ্রিল অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের লাশ ভেসে ওঠে। এরপর র‌্যাব ১১-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে কিলিং মিশনে অংশ নেয়ার অভিযোগ করেন নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম। ৫ই মে বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে স্বপ্রণোদিত হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে পুরো ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহজাহান আলী মোল্লাকে চেয়ারম্যান করে সাত সদস্যের কমিটি হয়। অন্যদিকে, সেভেন মার্ডারে র‌্যাবের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর র‌্যাব ১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্ণেল তারিক সাইদ মাহমুদ, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার রানাকে অবসরে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চের নির্দেশে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা এরই মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মামলায় জেরবার বিরোধী জনপ্রতিনিধিরা by কাফি কামাল ও আহমেদ জামাল

৫ই জানুয়ারির আলোচিত নির্বাচনের পরই উপজেলা নির্বাচনে বড় চমক দেখিয়েছিলেন বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। পৌরসভা আর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিরোধী জোটের প্রার্থীদের বড় জয়ে উচ্চাশা ছিল এ জোটের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু বছর না যেতেই বরখাস্ত, মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়ে কোণঠাসা বিরোধী জোটের জনপ্রতিনিধিরা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন নানা কারণে। কারও কারও বরখাস্তের প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনেকের বিরুদ্ধে আগেই রাজনৈতিক মামলা ছিল। নতুন করেও তাদের মামলায় জড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে হয়রানিরও। জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন উন্নয়ন কাজেও তারা বৈষম্যের শিকার। এতে যাদের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন হয়েছেন সেই ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না তারা। উপজেলা নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বেকায়দায় থাকা জামায়াতের প্রার্থীরা বড় চমক দেখালেও এখন এ দলটির নেতারাই বেশি বৈরিতার মুখোমুখি। এ পর্যন্ত জামায়াত সমর্থিত চারজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বরখাস্ত হয়েছেন আটজন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। বিএনপি সমর্থিত জনপ্রতিনিধিরা বেশি জর্জরিত মামলা ও হয়রানিতে।
বিএনপির জনপ্রতিনিধিরা কোণঠাসা
মাথার ওপর জনগণের প্রত্যাশার চাপ। নেই অর্থ বরাদ্দ। স্থবির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সিটি করপোরেশনগুলোতে দাতা সংস্থার অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর মেয়াদও শেষ পর্যায়ে। আসছে না নতুন প্রকল্পও। সামনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও স্থানীয় এমপিদের প্রতিবন্ধকতার দেয়াল। পেছনে মামলা-হামলার তাড়া। ঘাড়ের ওপর খড়গ হয়ে আছে স্থানীয় সরকার আইনের নানা ধারা। পৌরসভা আইন ২০০৯-এর ৩১ ও ৩২ ধারা অনুযায়ী পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে কোন মামলার চার্জশিট হলে তার বরখাস্ত ও অপসারণ করা যাবে। বিএনপি সহ বিরোধীদল সমর্থিত পৌর মেয়রদের বিরুদ্ধে সে ধারাকে ব্যবহার করা হচ্ছে আইনি অস্ত্র হিসেবে। বিরোধী জোটের ডাকা কর্মসূচিসহ স্থানীয় নানা ঘটনায় দায়ের করা হচ্ছে একের পর এক মামলা। বরখাস্ত ও অপসারণসহ মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে নিম্ন থেকে উচ্চ আদালতে। মামলা জটিলতায় আত্মগোপনে যাওয়া ও আদালতে দৌড়ঝাঁপের কারণে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে ব্যাঘাত ঘটেছে সিটি, পৌর ও উপজেলা পরিষদের কার্যক্রমে। এমন পরিস্থিতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বিএনপি সমর্থিত সিটি মেয়র, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। দেশের বিভিন্ন জেলার বিএনপি সমর্থিত অন্তত ১০ জন জনপ্রতিনিধি এমন তথ্য জানিয়েছেন। তারা অভিযোগ করছেন, সাধারণ বরাদ্দ কমিয়ে বিশেষ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ বরাদ্দের সে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে সরকার দলীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের মাধ্যমে। লোকাল রাজস্বের সীমিত আয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম। কিন্তু এলাকার জনগণ উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রদের দিকে তাকিয়ে আছেন, কবে প্রতিশ্রুতি দেয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কিছু হলেও শুরু ও বাস্তবায়ন ঘটবে। আবার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েও পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা সীমিত হয়ে পড়েছেন একটি কার্যালয় ও কিছু চেয়ার-টেবিলে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্য সম্মানও। আবার উপজেলা পরিষদ অধ্যাদেশ ২০০৯-এর ২৫, ২৬ ও ৪২ ধারা অনুযায়ী স্থানীয় এমপিকে উপজেলা চেয়ারম্যানদের মাথার ওপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে উপদেষ্টা হিসেবে। বিভিন্ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ইউএনওদের। তাদের হাতের মুঠোয় বন্দি স্থানীয় সরকারের উপজেলা পরিষদ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, সরকার সমর্থিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বরাদ্দ পেলেও বিএনপি সমর্থিতদের কাছে তা হয়ে ওঠেছে সোনার হরিণ। উন্নয়ন বা সেবামূলক কোন কাজের অর্থ বরাদ্দ এবং সিদ্ধান্ত সবকিছুই নিচ্ছেন সরকারদলীয় স্থানীয় এমপি ও ইউএনওরা। সম্প্রতি বিভাগওয়ারী বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। সে সব মতবিনিময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সরকারি অনিয়ম ও বঞ্চনার নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। খালেদা জিয়া সরকারের এমন ভূমিকার সমালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ২০দলীয় জোট সরকার গঠন করতে পারলে স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়ার অঙ্গীকার করেন।
মামলায় জর্জরিত বিএনপি সমর্থিত জনপ্রতিনিধিরা
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেবল কেন্দ্রীয় নেতারাই নন, মামলা খড়গে বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। সিটি মেয়র থেকে শুরু করে পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরাও বিভিন্ন মামলার আসামি। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সরিয়ে দেয়া হয়েছে দায়িত্ব থেকে। কেউ কেউ উচ্চ আদালতে লড়াই করে দায়িত্ব ফিরে পেলেও চলছে অনেকের লড়াই। সর্বশেষ একদশক আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার সম্পূরক চার্জশিটে আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জের পৌর মেয়র জিকে গউছের নাম। মামলার পর থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন তারা। সম্প্রতি বিএনপির একটি কেন্দ্রীয় বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে রাস্তায় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন গাজীপুর সিটি মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান। ওই দিন তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় বেআইনি অস্ত্রে সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে। ২০১৩ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কেন্দ্র ঘোষিত আন্দোলন কর্মসূচি পালনকালে দুদফা গুলিবিদ্ধ হন রাজশাহী সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় পুলিশের গাড়িতে বোমা হামলায় ঘটনায় পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ রায় হত্যাকাণ্ড, পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ও বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসিকে গুলি করার অভিযোগে। ওই মামলায় তিনি দু’দফা স্বল্প মেয়াদে কারাভোগও করেন। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় চার্জশিট দেয়া হলেও হুলিয়া মাথায় নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সিটি করপোরেশনের জমি উদ্ধার সংক্রান্ত ঘটনায় এখন অন্যের জমিতে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে দু’টি মামলার আসামি করা হয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামালকে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের মামলা। ৮ই নভেম্বর রাতে একটি ইজিবাইক পোড়ানোর মামলায় আসামি করা হয়েছে খুলনার সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মনজুর আলমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা না থাকলেও রয়েছে ভূমি দখলের মামলা। নানা মামলায় কারাভোগ করছেন পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের অনেকেই। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে ২রা সেপ্টেম্বর, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদকে ১১ই জুন বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া গ্রেপ্তার করা হয় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক কবির, পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান আবদার, বোদা উপজেলা চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফিকে। পবিত্র হজ নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রতিবাদে গত ১লা অক্টোবর যশোরে এক মানববন্ধনে হামলার ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের হয়। এতে যশোর পৌর মেয়র মারুফুল ইসলাম, কেশবপুর পৌর মেয়র আবদুস সামাদ বিশ্বাস, মনিরামপুর পৌর মেয়র শহীদ ইকবাল, বাঘারপাড়া পৌর মেয়র আবদুর রহিম মনাকে আসামি করা হয়।
বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার, মর্যাদাও পাচ্ছি না: বুলবুল
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, আমি যখন নির্বাচিত হয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছি তখন করপোরেশনের ঋণ ছিল ৪২ কোটি টাকা। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই দায়িত্বগ্রহণ ও পালন করছি। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনে তিন ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়। প্রথমত, একনেকের মাধ্যমে ৩-৫ বছর মেয়াদি কিছু প্রকল্পের কাজ পরিচালিত হয়। এটা একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রকল্প। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রতি বছর থোক বরাদ্দের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। সাধারণত স্বচ্ছতা ও সমান দৃষ্টিতে সেটা বণ্টন হলে আমরা কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা পেতাম। কিন্তু এবার দেয়া হয়েছে ৮ কোটি টাকা। বাকি টাকা থেকে পরবর্তী সময়ে উনার ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু বরাদ্দ দেন। তৃতীয়ত, দাতা দেশ ও সংস্থার অর্থায়নে হতদরিদ্র ও দরিদ্রদের জন্য কিছু প্রকল্প পরিচারিত হয়। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অধীনে ইউএনডিপির অর্থায়নে যে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে সেখানে ৮০ হাজার মহিলা কর্মরত। এর মাধ্যমে হতদরিদ্র ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্যানিটেশন, শিক্ষাসহ নানা উৎসাহব্যঞ্জক ও প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বর্তমানে সে সব প্রকল্পের গতিও ধীর হয়ে পড়েছে। আগামী মার্চে সে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আগামীতে তা নিয়মিত থাকবে কিনা অনিশ্চিত। রাসিক মেয়র বলেন, আমরা রাজস্ব আয়ের উপর চলছি। চেষ্টা করছি, নানাখাত থেকে সতর্কতার সঙ্গে ও নায্যতার ভিত্তিতে নিজস্ব আয় বাড়ানোর। সিটি করপোরেশন সাবলম্বী হলে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দিতে পারবো। বুলবুল বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া আমাদের দাতাদের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ নেই। এখন সরকার যদি রাজনৈতিক বিভাজনের দৃষ্টিতে না দেখে সদিচ্ছার মাধ্যমে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় তবে মানুষের জন্য উপকার হবে। আমরা সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে চাই। আমাদের দাবি, সিটি গভর্নর সিস্টেম চালু হোক। রাসিক মেয়র দুঃখ করে বলেন, সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। মান-মর্যাদাও পাচ্ছি না। সরকার আমাদের পতাকা দেয়নি, স্ট্যাটাস দেয়নি, এমন কি বডিগার্ড দেয়নি। আমরা সত্যিকার অর্থেই অরক্ষিত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।
বিএনপি সমর্থিতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র এখন ৩১-৩২ ধারা: ম্যাব মহাসচিব
নাটোরের সিংড়া পৌর মেয়র ও মিউনিসিপ্যাল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর মহাসচিব অধ্যাপক শামীম আল রাজী বলেন, পৌরসভাগুলোতে এডিপি বরাদ্দ কম-বেশি হচ্ছে। তবে সেটা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এ, বি ও সি ক্যাটিগরির পৌরসভাকে ৭০, ৬০ ও ৫০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। চলতি অর্থ বছরে কমিয়ে প্রতিটি ক্যাটিগরির ক্ষেত্রে নামিয়ে আনা হয়েছে সমান ৪০ লাখে। তিনি বলেন, চলতি অর্থ বছরে পৌরসভার জন্য মোট বরাদ্দ ৩৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২৬ কোটি টাকা সাধারণ বরাদ্দ ও ১৯৯ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ। এই বিশেষ বরাদ্দের অর্থ বিশেষ ভাবেই বরাদ্দ হয়। আর তাতে বঞ্চিত হয় সারা দেশের পৌরসভাবাসী। ম্যাব মহাসচিব বলেন, সম্প্রতি পুরনো মামলার চার্জশিটে যুক্ত করা হয়েছে হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জিকে গউছের নাম। ঝালকাঠির নলছিটি, চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জের পৌর মেয়র অপসারণের শিকার। নাটোরের নলডাঙ্গার পৌর মেয়র অপসারণের হওয়ার পর হাইকোর্টে মামলা করে পদ ফিরে পেয়েছেন। ম্যাব মহাসচিব বলেন, আমরা আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে আইনের দুর্বলতা ও কালো আইনগুলো রহিতকরণসহ ১৬ দফা দাবি নিয়ে সংগ্রাম করছি। নোয়াখালী পৌর মেয়র হারুনুর রশিদ আজাদ বলেন, বড় প্রকল্পগুলো দলীয় বিবেচনায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রদের দেয়া হচ্ছে।
বরাদ্দ নেই, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও নেই: উপজেলা চেয়ারম্যানবৃন্দ
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ার কথা। নির্বাচিত হওয়ার পর ৬ মাসেও কোন বরাদ্দ পাইনি। উপজেলা পরিষদের রাজস্ব আয় থেকে প্রত্যাহিক কার্যক্রম চলছে। এমনিতেই উপজেলা পরিষদকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে না সরকার। তার ওপর আমরা বিরোধী জোটের রাজনীতি করি তাদের কোন কাজ করারই সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। পদ ছাড়া বলতে গেলে কিছুই পাইনি। এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দূরে থাক এখন নানা মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা চেয়ারম্যান মুহিত তালুকদার বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ ৮ মাস কেটে গেলেও এডিপির একটি টাকাও পায়নি উপজেলা পরিষদ। গত জুন ও সেপ্টেম্বরে যে বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল সেটাও পাইনি। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ৬ মাস পার হয়ে গেলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য কোন বরাদ্দ পাইনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আসিফ খান বলেন, স্থানীয় বিভিন্নখাত থেকে কিছু রাজস্ব আসে সেগুলো দিয়েই চলছে উপজেলার কার্যক্রম। সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া স্থানীয় রাজস্বের ১ ভাগ টাকার অংশ হিসেবে ৬০ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। সেখান থেকে এডিপির কাজের বকেয়া হিসেবে ১২ লাখ টাকা পরিশোধ, ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ৩ লাখ টাকা করে ২৪ লাখ টাকা উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত ২৫ লাখ টাকা অনুদান নিয়ে এবং উপজেলা পরিষদ থেকে ২২ লাখ টাকাসহ ৪৭ লাখ টাকায় আশুগঞ্জের একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি অফিস বা অনুষ্ঠানাদিতে প্রাপ্ত সম্মানও পাই না। দাওয়াত পাই, গিয়ে দেখি অংশগ্রহণের পরিবেশ নেই।
বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে জামায়াতের জনপ্রতিনিধিরা
নানামুখী চাপে উপজেলা নির্বাচনের বিজয় ধরে রাখতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচিত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের একের পর এক গ্রেপ্তার, বহিষ্কার, জামায়াতের তৃণমূল নেতৃত্বকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। নানা আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে জামায়াত সমর্থিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। সম্প্রতি চার উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার, ৮ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বহিষ্কার হয়েছেন। এর আগে শপথ নিতে গিয়েও গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকজন। গ্রেপ্তার আর বহিষ্কারের পাশাপাশি হামলা-মামলার ভয়ে বেশ ক’জন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা পরিষদের নিয়মিত কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছেন না। ফলে স্বাভাবিক কারণে সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের অর্জিত বিজয় রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতা বলছেন, সরকারের অসহযোগিতার কারণে জামায়াত উপজেলার সুফল ভোগ তো দূরের কথা, এখন পদ রক্ষা করাই দায় হয়ে পড়ছে। তবে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের পদ ফিরে পাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন দলটির নেতারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দলের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ডের রায়, সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নামে অসংখ্য মামলা ও গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে জামায়াতে ইসলামীকে। এমন অবস্থায় উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের অপ্রত্যাশিত বিজয়ে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে দলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতি বহাল থাকায় উপজেলা পরিষদের সেই বিজয়ী পদগুলো রক্ষা করতে এখন রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে জামায়াতকে। এব্যাপারে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। প্রায় একই সুরে মন্তব্য করেছেন দলটির নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। সম্প্রতি পর পর কয়েকজন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হীন উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। তিনি বলেন, জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়েই সরকার বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করেছে। সরকার সাজানো মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করার পর এবার তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে তাদের সেবা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্তের মধ্য দিয়ে এ সরকারের একদলীয় ফ্যাসিবাদী চরিত্র অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সূত্র জানায়, বিভিন্ন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জামায়াতের উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ ডজনখানেক জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। এছাড়া গ্রেপ্তার আতঙ্কে বেশির ভাগ চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন আত্মগোপনে। এতে উপজেলা পরিষদের কাজে সময় দিতে পারছেন না তারা। নানা কায়দা কৌশলে মাঝে মধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উপজেলা কার্যালয়ে গিয়ে  হাজিরা দিয়ে আসছেন কেউ কেউ। তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে পারছেন না তারা। উল্লেখ্য, ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত ৪র্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৩৬টিতে চেয়ারম্যান পদে, ১২৬টিতে পুরুষ এবং ৩৬টিতে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলটির প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। বিজয়ী প্রার্থীদের প্রায় সবাই স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। নির্বাচন শেষে এপ্রিলে শুরু হওয়া শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে ১০ চেয়ারম্যানসহ অন্তত ২৫ জনপ্রতিনিধি পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। পরে বিভিন্ন সময়ে প্যারোলে বা জামিনে মুক্তি পেয়ে শপথ গ্রহণ করেন তারা। শপথ নিলেও গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও আটক থাকার কারণে পরিষদের দায়িত্ব বুঝে পেতে কারও কারও সাত মাস সময় লেগেছে। এর মধ্যে কয়েক দফা আটক হয়েছেন বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যান ও ভাইস  চেয়ারম্যান। বিভিন্ন মামলার আসামি করে চার্জশিট দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে অন্তত ছয়জনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ই নভেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মণ্ডলকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ চারটি ‘নাশকতা’র মামলা রয়েছে। নুরুল ইসলাম মণ্ডল স্থানীয় জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল। গত ১৮ই নভেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলায়মান সরকার সাজুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। মাজেদুর রহমান জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু  সোলাইমান সরকার সাজু সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি। গত ১লা অক্টোবর সুন্দরগঞ্জ পৌর মেয়র জামায়াত নেতা নুরুন্নবী প্রামাণিক সাজুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাকে ১১টি নাশকতার ঘটনায় আসামি করা হয়। গত ২রা অক্টোবর গাইবান্ধা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল করিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এই বরখাস্তের আদেশ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল করিমের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা দু’টি মামলা গাইবান্ধার পৃথক দু’টি  আদালতে বিচারাধীন। এ কারণে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে ৮ই সেপ্টেম্বর বগুড়ার শেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান দবিবর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। ২রা সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও সুলতান মাহমুদ চৌধুরী উখিয়ার বৌদ্ধ মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। ইতিমধ্যে এ মামলার চার্জ গঠন করেছেন আদালত। এর  প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে বলে জানান জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ। এছাড়া, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা আবদুর রউফ, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল ইসলাম, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম এবং কয়েকটি উপজেলার চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানসহ ছয় থেকে সাতজন আটক রয়েছেন। ঢাকা মহানগর জামায়াত তরুণ সদস্য আতাউর রহমান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের অনেক চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানকে জামায়াত করার অপরাধে বরখাস্ত, গ্রেপ্তার করছে। তবে তাদের মনে রাখতে হবে জামায়াত এখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেছে। এসব করে জনগণের মন থেকে জামায়াতকে মুছে দেয়া যাবে না। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী বলেন, ২৪শে এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত নতুন সরকারি বরাদ্দ আসেনি। তেমন কোন কাজেরও সুযোগ পাইনি। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সত্যিকার অর্থে উপজেলা পরিষদের বিধি মোতাবেক একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে কোন কাজের সুযোগ আমরা পাচ্ছি না। এ ব্যাপারে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, স্বৈরাচারী সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ করতে দিচ্ছে না। সরকারের এ জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এদিকে আসন্ন বিজয় দিবসের আগেই অথবা জানুয়ারির প্রথম দিকে জামায়াত নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল সূত্রে জানা গেছে।

দেশ চায় সুষ্ঠু নির্বাচন -স্মরণসভায় মিলনের মা

শহীদ ডা. মিলন দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে ডা. মিলনের মা সেলিনা খাতুন সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের শাস্তি দাবি করে বলেছেন, যারা এই খুনি শাসককে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের এর ফল ভোগ করতে হবে। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণে স্বকীয়তা হারিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ আজও চেয়ে আছে দেশে সব দলের আলোচনার মাধ্যমে যেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। গতকাল ঢাকা  মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন আয়োজিত স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন। সেলিনা খাতুন বলেন, শুধু মিলনকে নয়, ’৮২ সাল থেকে ’৯০-এর ৪ঠা ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে গুলি করে হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। এসব হত্যার নেপথ্যে ছিলেন এরশাদ। এসব হত্যা ঘটনায় তার বিচার না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত ডা. শামছুল আলম খান মিলনের মা বলেন, সমাজে আজ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি আস্তানা গেড়েছে। চলছে দুর্নীতি, ঘুষ, হত্যা, সহিংসতার রাজনীতি। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো- নির্বাচন কমিশন, আইন বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে চলছে দলীয়করণ। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। ২৪ বছরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আজও চেয়ে আছে জনগণ। দেশের জনগণ চায় সকল রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশের স্বার্থে সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন। তিনি বলেন- আমি মনে করি এখনও সময় আছে ভবিষ্যতে একটি সুন্দর নির্বাচন আয়োজনের। ৯০-এর পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে সেলিনা খাতুন বলেন, স্বাধীন দেশে আপনারা ঘাতক এরশাদের বিচার করতে ব্যর্থ হলেন কেন এবং কার স্বার্থে? তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা দেখি ঘাতক অত্যাচারী সরকারপ্রধানরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অথবা তাদেরকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে। এ হত্যার বিচারের ব্যর্থতার জন্য তিনি বিএমএকেও দায়ী করেন তিনি। এরশাদের বিচার সম্ভব ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, কে সেদিন গুলি করেছিল তা চিহ্নিত করা না গেলেও যিনি হুকুম দিয়েছিলেন কেন তার বিচার হবে না? শুনে ব্যথিত হই, যখন তিনি বলেন- মানুষকে ভালবেসে রাজনীতি করেন। কি বিচিত্র এই দেশ! সত্যিই সেলুকাস! ছেলের স্মৃতিচারণ করে এই জননী বলেন, আমার ছেলে ছিল সচ্চরিত্র, সত্যবাদী। বাহুল্য সে পছন্দ করতো না। ডা. মিলন ছোটবেলা থেকেই ডায়েরি লিখতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, যখন সে ৭ম শ্রেণীতে পড়তো তখন সে ডায়েরির একটি পাতায় লিখেছিল- কার স্বাধীনতা? আমাদের আবার কিসের স্বাধীনতা? আমরা বাঙালিরা তো পাকিস্তানিদের দ্বারা নির্যাতিত, শোষিত। তখন থেকেই তার চরিত্রে ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ ঘটে। স্মরণসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বছর বছর ক্ষোভের সঙ্গে এই দিনে হত্যাকারীদের বিচার চাইতে হয়। তিনি বলেন- এখানে উপস্থিত মন্ত্রীসহ সকলেই জানেন সেদিন কে গুলি চালিয়েছিল। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ’৭১-এ হত্যার হুকুমের আসামি হিসেবে যদি নিজামী, গোলাম আযমের ফাঁসি হয় তবে কেন সেদিনের হত্যাকাণ্ডের ফাঁসির আসামি হিসেবে এরশাদের বিচার হবে না? তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ডা. মিলন ছাত্রজীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার নীতিতে অটল ছিলেন। তিনি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। একই সঙ্গে তিনি পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করে গেছেন। ৮০’র দশকে প্রকৌশল, কৃষিবিদ ও চিকিৎসাবিদদের সমন্বয়ে যে বিরাট আন্দোলন হয়েছিল তার পুরোধা ছিলেন তিনি। ইনু বলেন, সামরিক শাসন ও সামপ্রদায়িকতার জঞ্জাল সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং গণতন্ত্রের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামরিক ও সামপ্রদায়িক শক্তি তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। তিনি বিএনপির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, গজিয়ে ওঠা জঙ্গিবাদ এবং রাজাকারদের আশ্রয়স্থল খালেদা জিয়া ও বিএনপি। তারা সাংবিধানিক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদি ডা. মিলনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হয় তাহলে এই সাংবিধানিক হুমকি থেকে রক্ষা করতে অতীতের মতো ওদের পরাজিত  করে হটিয়ে দিতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, শুনেছি ’৯২ সালে যখন বিচার শুরু হয় তখন সাক্ষীদের বৈরী ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বিচারটি পুনরায় চালুর ব্যাপারে কথা বলবো। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যারও বিচার এক সময় অলীক ছিল সেটাও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। একাত্তরের ঘাতকদের বিচার দুঃস্বপ্নের মতো ছিল কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব চাপ উপেক্ষা করে সে বিচার করছেন। তিনি সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করে বলেন, গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্র। ভাল কাজের সমালোচনা হবেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন বিপ্লবীরা অনেক কথাই বলতে পারেন। তিনি বিচারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দণ্ড দেয় আদালত কিন্তু দায়ী করা হয় সরকারকে।
বিএমএ’র সভাপতি ডা. মাহমুদ হাসান সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বিএমএ’র তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক ডা. মিলনের সংগ্রাম ছিল গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি এবং গণমুখী স্বাস্থ্যনীতির পক্ষে। স্মরণসভা ছাড়াও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন  করেছে শহীদ ডা. মিলনের পরিবার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

Thursday, November 27, 2014

তাহলে হেলমেটের কাজ কী?

ফিল হিউজের দুঃখজনক মৃত্যু প্রশ্নবিদ্ধ করেছে হেলমেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে। মাথায় হেলমেট থাকার পরও কীভাবে সে দিন শন অ্যাবটের বাউন্সার হিউজকে এমন মারাত্মক আঘাত করল সেই প্রশ্ন এখন সবার। ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের মাথার শতভাগ নিরাপত্তা যে বর্তমান নকশার হেলমেট দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, সেটাও প্রমাণ হয়ে গেছে হিউজের এই দুঃসহ পরিণতির মধ্য দিয়ে। সেদিন শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচটিতে হিউজ এমন একটি নকশার হেলমেট পরেছিলেন, যা তাঁর মাথার নিচের দিকের অংশের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। অ্যাবটের বাউন্সারটি সরাসরি গিয়ে আঘাত করে হিউজের কানের নিচের অংশে। অনেকে হিউজের আঘাতটিতে ‘বিরল’ বা ‘ব্যতিক্রম’ বললেও বর্তমান ক্রিকেটে প্রচলিত হেলমেটের নকশার দুর্বলতার ব্যাপারটিই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে বারবার।
হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য হেলমেটের নকশার এই দুর্বলতার জন্য দায়ী করছেন ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের ‘ঐতিহ্য-প্রীতি’র বাতিককেই। তারকা ক্রিকেটারদের কাছে হেলমেট প্রস্তুতকারীরা অনেক সময় নতুন নতুন নকশা উপস্থাপন করলেও তাঁরা সব সময়ই নাকি পুরোনো নকশার প্রতিই পক্ষপাত প্রদর্শন করে এসেছেন। ক্রিকেটারদের অনীহার কারণেই বহু গবেষণালব্ধ নকশার হেলমেট বাজারে আনতে পারেনি প্রস্তুতকারীরা। ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালবিওন লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের ঐতিহ্য প্রীতির কারণেই আমরা হেলমেটের নতুন নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছি। ক্রিকেটে নতুন কিছু গ্রহণ করার প্রবণতাটা অনেক কম। এই বিনিয়োগটা বেসবল ও সাইক্লিংয়ের মতো খেলার সরঞ্জামাদির পেছনে করাটাই আমাদের কাছে বেশি লাভজনক। কারণ, এই খেলাগুলো নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে ক্রিকেটের মতো রক্ষণশীল নয়।’
২০০৯ সালে একটি ওয়ানডে ম্যাচে নতুন ধরনের একটি হেলমেট পরে মাঠে নেমেছিলেন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ব্রিস ম্যাকগ্রেইন। অ্যালবিওন কোম্পানির তৈরি হেলমেটটি ছিল গবেষণালব্ধ নকশার ওপর ভিত্তি করে বানানো। ওটা ব্যবহার করে ম্যাকগ্রেইন ও অন্যান্য ক্রিকেটাররা মতামত দেওয়ার পরই অ্যালবিওন তা বাজারে ছাড়ত। নতুন ওই নকশাটি ম্যাকগ্রেইনের বেশ পছন্দ হয়। পুরো মাথার সুরক্ষা বিধান করা ওই হেলমেটটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারে আনতে পারেনি অ্যালবিওন। ম্যাকগ্রেইনের পছন্দ হলেও তা পছন্দ হয়নি ‘ঐতিহ্যপন্থী’ অন্যান্য ক্রিকেটারদের। ম্যাকগ্রেইন তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি ওটা পরে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বিদ্রূপের শিকার হই। আমার সতীর্থরাও অদ্ভুত নকশার হেলমেটটি না পরার অনুরোধ করেছিল। শুনেছি, টেলিভিশন ধারাভাষ্যকাররা নাকি আমাকে “রোবোকপ” অভিধা দিয়েছিলেন।’
বেশির ভাগ ক্রিকেটার পছন্দ না করার জন্যই নাকি ওই নকশাটি বাজারে আনতে পারেনি অ্যালবিওন। অথচ অনেক গবেষণা করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থাই ছিল ওই নকশায়।
এ ব্যাপারে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির ভূমিকাও কম গোলমেলে নয়। ক্রিকেট মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইসিসির ভূমিকাটা নাকি কখনোই জোরালো নয়। মাত্র গত বছর আইসিসি ক্রিকেট হেলমেটের ব্যাপারে একটি বিশেষ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। এই বিশেষ নিরাপত্তা মানের ব্যাপারটি হলো হেলমেটের গ্রিল-সংক্রান্ত। এতে প্রস্তুতকারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ফাঁকা অংশ দিয়ে বল যেন কোনোভাবেই ব্যাটসম্যানের মুখাবয়বকে আঘাত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০১৩ সালে গ্রহণ করা এই সুপারিশটি ছিল গত ১৫ বছরে এ-সংক্রান্ত প্রথম কোনো সিদ্ধান্ত। ক্রিকেট মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইসিসি যে কতটা উদাসীন, তার একটা বড় উদাহরণ হতে পারে এই তথ্যটি।
হিউজের মৃত্যু এ ব্যাপারে আইসিসিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। সংস্থাটির সাবেক সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া এই দুঃখজনক ঘটনার পর দাবি তুলেছেন, ক্রিকেটের সুরক্ষা-সরঞ্জামাদির পুনর্মূল্যায়নের। বলেছেন, ‘হিউজের ঘটনা এ ব্যাপারটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে।’ সূত্র: রয়টার্স।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও পারলেন না হিউজ

ক্রিকেট মাঠে ঘটল আরও একটি মৃত্যুর ঘটনা। ক্রিকেট খেলায় ব্যবহৃত পাঁচ আউন্স ওজনের বলটি যে মাঝে-মধ্যে খেলোয়াড়দের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তারই আরেকটি নমুনা দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। বোলারের বাউন্সারের ছোবলে আহত হয়ে দুই দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যুর মুখোমুখি হলেন প্রতিশ্রুতিশীল অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ। আজ বৃহস্পতিবার সিডনির একটি হাসপাতালে কোমায় অচেতন অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পঁচিশ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার দেশের হয়ে ২৬টি টেস্ট ও ২৫টি ওয়ানডে ম্যাচের অভিজ্ঞতায় ছিলেন ঋদ্ধ। জীবনের শেষ খেলাটিতেও দারুণ ব্যাট করছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা-শেফিল্ড শিল্ডের একটি ম্যাচে মঙ্গলবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিউ সাউথওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন হিউজ। ৬৩ রানে অপরাজিত থাকার সময় প্রতিপক্ষের বোলার শন অ্যাবোটের একটি বাউন্সারই ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। কানের পাশে আঘাত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারান তিনি। হাসপাতালে নিবিড়-পরিচর্যাকেন্দ্রে দু’দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও ফিরতে পারলেন না তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ঘটনার নায়ক হয়েই জীবনের ওপারে যাত্রা করলেন তিনি।
সিডনির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তাঁর মস্তিষ্কে।আঘাতটা এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচারটা কোনো কাজেই এল না তাঁর।। মৃত্যুর সময় হিউজের সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা, বোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন।
২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গের তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়। ২৬ টেস্টে ৩২.৬৫ গড়ে ১৫৩৫ রান করা এই ক্রিকেটারের আছে তিনটি সেঞ্চুরি আর সাতটি ফিফটি। অভিষেক সিরিজেই ডারবানে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করে দারুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন হিউজ। তবে ফর্মের ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে অস্ট্রেলীয় দলের কখনোই নিয়মিত হতে পারেননি। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলা হিউজ ভারতের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজে নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন।অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের চোট তাঁর দলে ফেরা মোটামুটি নিশ্চিতই করে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ ফর্মেই ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনা শেষ অবধি তাঁকে নিয়ে গেল সব জাগতিক আশা-আকাঙ্খা আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির উর্ধ্বেই।

ট্রাফিক আইন মানেন না যাঁরা by মোর্শেদ নোমান

(ছবি:১-পুলিশ সদস্যরাও সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি ফার্মগেট থেকে তোলা। ছবি:১-উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে প্রভাবশালীরা দ্রুত সড়ক পাড়ি দেন। ছবিটি আবদুল গণি রোড থেকে তোলা। ছবি:১-পুলিশ সদস্যরাও সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি আবদুল গণি রোড থেকে তোলা। ছবি:১-ট্রাফিক আইন না মেনে অনেক প্রভাবশালী সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি ফার্মগেট পুলিশ বক্সের সামনে থেকে তোলা হয়েছে। ছবি: জাহিদুল করিম ও মনিরুল আলম) ২৪ নভেম্বর সোমবার, বেলা সাড়ে ১১টা। ফার্মগেট এলাকার খামারবাড়ির সামনে পুলিশ বক্সের মোড়। সেখান থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মোড় পর্যন্ত গাড়ির লম্বা সারি। অনেক গাড়ি আধা ঘণ্টারও বেশি সময় সিগন্যালে আটকে আছে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায়। হঠাৎ করেই ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-০৯৬০ নম্বরের একটি গাড়ি পাশের সড়ক দিয়ে এসে রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগিয়ে এল। ট্রাফিক সদস্যরা উল্টোপাশের সিগন্যালের গাড়ি আটকে ওই গাড়িটিকে পার করে দিলেন। একই দিন বেলা দুইটা। রাজধানীর আবদুল গণি রোড। সচিবালয় এলাকার এ সড়কে হঠাৎ করেই দেখা গেল উল্টো দিক থেকে একটি গাড়ি আসছে। ঢাকা মেট্রো-ঘ-সিরিজের ওই গাড়িটি ট্রাফিক সদস্যদের সামনে দিয়ে উল্টো দিক থেকে বেরিয়ে গেল। রাজধানীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। প্রতিদিনই রাজধানীর প্রতিটি সড়কেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার দৃশ্য দেখা যায়। আইন ভাঙার এ দলে মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীসহ অনেকেই রয়েছেন।
জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা আইন মানার কথা, তাঁরাই যদি আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আইন অমান্য করার এ প্রবণতাটি বন্ধে ইতিমধ্যেই ট্রাফিক সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না, সেটা তদারক করবেন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা।
উল্টোপথে যাওয়া, হেলমেট ছাড়া রাস্তায় চলাচলসহ আইন অমান্য করার কারণে অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
যানজটের মহানগর ঢাকায় প্রতিদিনই নগরবাসীকে একটি বড় সময় রাজপথেই কাটাতে হয়। ঢাকার কয়েকজন ট্রাফিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যেদিন রাস্তায় বের হন, সেদিন যানজটের পরিমাণ যেন অনেকটাই বেড়ে যায়। তাঁদের নিরাপত্তার কথা ভেবে অবশ্য বেশির ভাগ মানুষ এ দুর্ভোগ মেনে নেন। সমালোচনাও কম হয় না।
অনেক প্রভাবশালী মানুষই রাস্তায় যানজট এড়িয়ে নির্বিঘ্নে যাওয়ার চেষ্টায় থাকেন। তা করতে গিয়ে সড়কের অন্য অংশগুলোতে যান চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হয়। তখনই ওই অংশে যানজটের পরিমাণ বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে সাইরেন বাজিয়ে সাংসদদের গাড়িগুলো যখন উল্টোপথে আসে, তখন ট্রাফিক সদস্যদের কিছুই করার থাকে না; বরং অন্য গাড়িগুলোকে থামিয়ে এসব গাড়ি পার করে দেন তাঁরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, এসব গাড়ি এক মিনিট দেরি করালে নিজেদের চাকরির ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক ট্রাফিক সদস্যকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফার্মগেট পুলিশ বক্সের সামনে কাজী আলমগীর হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক বড়। তাই তাঁরা যখন চলাচল করেন, তখন খারাপ লাগে না। কিন্তু যখন এমপি-মন্ত্রী-আমলারা রাস্তায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তৈরি করে নিজেরা আরামে চলতে চান, সেটা খুব খারাপ লাগে।’
ট্রাফিকের আরেক সদস্যের ভাষ্য, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সাংসদ, আমলার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের গাড়ি চলাচলের সময়ও তাঁরা দ্রুত পার করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তার এ সুবিধা পাওয়ার কথা না থাকলেও তাঁদের সেই সুবিধা দেওয়া হয়। ট্রাফিকের ওই সদস্য বলেন, ওই সময় সড়কের ওপর সাধারণ মানুষ যখন বিভিন্ন কটু মন্তব্য করেন, তখন খুব খারাপ লাগে।
সাজিয়া ইসলাম নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়। হঠাৎ করে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে প্রভাবশালীদের পার করে দেওয়ার বিষয়টি খুব কষ্ট দেয়।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাঁদের সময়ের মূল্য আছে, আমাদের নেই?’
পল্টন, শেরাটন মোড়, কাকরাইল, শাহবাগ এলাকায় বেশ কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের গাড়ির চালক ও সংবাদকর্মীরাও আইন ভাঙার তালিকায় বড় আকারে রয়েছেন। দ্রুত অফিস বা অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার কথা বলে তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে উল্টোদিকের সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রভাবশালীদের গাড়ি আটকানোর ক্ষেত্রে যে ধরনের ভীতি থাকে, সংবাদকর্মীদের বেলায়ও একই অনুভূতি কাজ করে ট্রাফিক সদস্যদের মধ্যে। চাইলেও কিছু করতে পারেন না বলে জানান এসব ট্রাফিক সদস্য।
রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতে। এর মাধ্যমেই প্রভাবশালীদের নির্বিঘ্নে পারাপারের ব্যবস্থা করতে পারেন ট্রাফিক সদস্যরা। এক মিনিট পর যে সিগন্যাল চালু হওয়ার কথা, সেই সিগন্যাল চালু করা হয় কয়েক মিনিট পর। সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় দীর্ঘ যানজটের বিড়ম্বনায়।
ইলিয়াস কাঞ্চন আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আইন ভঙ্গকারীর পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের শাস্তি দিলে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে। আর তখনই সাধারণ মানুষ আইন মানার বিষয়ে সচেতন হবে।